দেশের কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি কার্যক্রম আরও সুসংহত করতে সারা দেশে ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির এক বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৬০ শতাংশ নারী এবং ৪০ শতাংশ পুরুষের অংশগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত সম্ভাবনাময় কৃষি খাতকে আরও এগিয়ে নিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্র্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরেমশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রিপ্রিনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)’, ডিপার্টমেন্ট অব অ্যাগ্রিকালচারাল মার্কেটিং বা ডিএএম প্রকল্পের মাধ্যমে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪টি জেলার মোট ২০৮টি উপজেলায় ২০ হাজার কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের অধীনে কৃষি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বীজ উৎপাদন, নার্সারি, মাশরুম চাষ, ভার্মি কম্পোস্ট, পাটজাত ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন উপখাতে উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। পাশাপাশি পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্যের জন্য ভ্যালুচেইন-ভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় উদ্যোক্তা হতে হলে আবেদনকারীর বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হতে হবে।
প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের অন দ্য জব প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ইনকিউবেশন সাপোর্টের মাধ্যমে পাঁচটি নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি নিশ্চিত করতে কাজ করা হচ্ছে। এই পাঁচটি কৃষিপণ্য হলো: আলু, আম, কাঁঠাল, টমেটো ও সুগন্ধি চাল। এই পণ্যগুলোর জন্য ভ্যালু চেইন প্রমোশনাল বডি গঠন করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভ্যালুচেইন প্রমোশনাল বডির নীতিমালা ইতিমধ্য়েই মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত হয়েছে।
প্রশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের জন্য ম্যাচিং গ্রান্ট সহায়তা প্রদান করা হবে। এই সহায়তার আওতায় গৃহপর্যায়ে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রপাতি প্রদান করা হবে। এসব যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্প থেকে ৭০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হবে এবং বাকি ৩০ শতাংশ অর্থ উদ্যোক্তাদের নিজেদের বহন করতে হবে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পার্টনার, ডিএএম অঙ্গের এজেন্সি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, “মাশরুম, নার্সারি, ভার্মি কম্পোস্ট, পাটজাত পণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক খাতে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ চলেছ। এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৮৭৫ জনেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরে প্রায় সাত হাজার উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।”
ড. আব্দুল্লাহ আল ফারুক আরও জানান, সারা দেশের ৬৪ জেলা ও ২০৮টি উপজেলায় এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, “প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শুধু উদ্যোক্তা তৈরি নয়, তাদের ব্যবসায়িক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা জ্ঞান ও বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রশিক্ষণ শেষ করার পর উদ্যোক্তাদের ইনকিউবেশন সাপোর্ট প্রদান করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য যে সকল বাধা রয়েছে, তা দূর করার প্রক্রিয়া নিয়ে ইনকিউবেশন প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।”
ডিএএম-এর আওতায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় এই ধরনের ৭৬৭টি স্কুল গঠন করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ড. আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেন, “যে এলাকায় যে পণ্যের উৎপাদন বেশি, সেখানে সেই পণ্যকে কেন্দ্র করে মার্কেট অ্যাক্টরস বিজনেস স্কুল গড়ে তোলা হচ্ছে। আলুর ক্ষেত্রে ২২৭টি স্কুল করা হয়েছে। এ বছর আরও ৩৩৫টি স্কুল করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, এই স্কুলগুলোর মাধ্যমে কৃষক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, হিমাগার মালিক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যান্য বাজার-অংশীজনকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কৃষিপণ্যের সামগ্রিক বাজারব্যবস্থার সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।
উদ্যোক্তাদের দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রগতির কান্ডারি হিসেবে অভিহিত করে পার্টনার প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, “উদ্যোক্তারা শুধু নিজে স্বাবলম্বী হয় না, তারা সমাজের আরও দশজনকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হতে হলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদেরও বিভিন্ন নতুন নতুন ধ্যানধারণা নিয়ে কাজ করে, সেগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কৃষিকে আধুনিক ও সম্মানজনক পেশায় পরিণত করা সম্ভব হবে। প্রশিক্ষণ নেওয়া উদ্যোক্তারা তাদের পপ্রাণচাঞ্চল্য, কর্মস্পৃহা ও জীবনী শক্তি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেবন।”
কৃষি খাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি খাত বাংলাদেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। তবে বাস্তবধর্মী ও ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনার অভাব, আধুনিকায়নের ঘাটতি এবং নতুন উদ্যোক্তার স্বল্পতার কারণে এই খাতটি পিছিয়ে ছিল। অথচ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রপ্তানি বৃদ্ধিতে কৃষি খাতের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমান সরকারের এই উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগটি সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।