ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কুমড়া বাড়িয়া ইউনিয়নের গোয়ালবাড়িয়া গ্রামের একখণ্ড অনাবাদি জমি এখন সবুজে ঘেরা এক বাণিজ্যিক ফলবাগানে রূপান্তরিত হয়েছে। আগাছায় ভরা সেই পতিত জমিতে এখন সারি সারি ড্রাগন ফলের গাছের পাশাপাশি ফলছে মাল্টা ও কমলা। ফলন এবং বিক্রির ব্যাপক সাফল্যে মুখর হয়ে উঠেছে ছয় বিঘার এই বাগানটি। পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেও ছয় ভাইরাভাই মিলে কৃষির এই সফল উদ্যোগটি গড়ে তুলেছেন।
ছয় বছর আগে মাত্র দুই বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষের মাধ্যমে এই বাগানটির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সেই উদ্যোগের পরিধি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় বিঘায়। ‘এম এম গ্রিন ফিল্ড’ নামের এই কৃষি প্রকল্পে ড্রাগনের পাশাপাশি মাল্টা ও কমলার চাষ করা হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা রয়েছে, আগামী বছর আরও দুই বিঘা জমি যুক্ত করে সেখানে অ্যাভোকাডো, মাল্টা ও কমলার বাগান আরও সম্প্রসারণ করার।
এই প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে পাঁচজন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিজীবী এবং একজন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। শুরুর দিকে পাঁচ ভাইরাভাই মিলে প্রায় আট লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। তারা জানান, প্রত্যেকে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা করে মূল বিনিয়োগের অর্থ তুলে নিয়েছেন। এর বাইরে প্রত্যেকের প্রায় ছয় লাখ টাকা করে লাভ হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
চলতি বছরেও বাগানে আশানুরূপ ফলন হয়েছে। উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা হয়েছে। মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই বিক্রির পরিমাণ ২০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।
বাগানটি গড়ে উঠেছে তাদের শ্বশুরের একটি পতিত জমিতে। শুরুতে ড্রাগনের চারা রোপণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে এখানে নতুন নতুন ফলের জাত যুক্ত করা হয়েছে। মাটি ও আবহাওয়ার উপযোগিতা বিবেচনা করে ফলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাগানটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করে তুলতে তারা নিরলস কাজ করছেন।
কৃষিকে কেবল শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক ব্যবস্থাপনার আওতায় এনেছেন এই উদ্যোক্তারা। বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ, আগাছা দমন, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ এবং ফল সংগ্রহের জন্য একজন শিক্ষিত ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাকে মাসিক সম্মানজনক বেতন দেওয়া হয়। পাশাপাশি সারা বছর চার থেকে পাঁচজন শ্রমিক বাগানে কাজ করেন। এর ফলে অনাবাদি জমি যেমন উৎপাদনশীল হয়েছে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
মেজ ভাইরাভাই, শিক্ষক ও সাংবাদিক মিজানুর রহমানের কৃষির প্রতি প্রবল আগ্রহ থেকেই মূলত এই উদ্যোগের সূচনা। তিনি বিভিন্ন কৃষি খামার ও ফলবাগান পরিদর্শনে অন্য ভাইরাভাইদের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আধুনিক পদ্ধতিতে ফল চাষ, বাগান ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের সাফল্য দেখে তাদের মধ্যেও কৃষিতে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হয়।
সেই আগ্রহ থেকেই ছয় বছর আগে দুই বিঘা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু করেন তারা। প্রথম দিকে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও ধীরে ধীরে চাষের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়। ফলন ও বাজারজাতকরণে সাফল্য পাওয়ার পর তারা বাগানের পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। একপর্যায়ে ড্রাগনের পাশাপাশি যুক্ত হয় মাল্টা ও কমলা।
বড় ভাইরাভাই ও শিক্ষক লিয়াকত বলেন, “আমরা প্রত্যেকে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকা করে বিনিয়োগ করেছিলাম। সেই টাকা ইতিমধ্যে তুলে নিয়েছি। এর বাইরে প্রত্যেকে প্রায় ছয় লাখ টাকা করে লাভ পেয়েছি। চাকরির পাশাপাশি কৃষি থেকে বাড়তি আয় আমাদের উৎসাহ আরও বাড়িয়েছে।”
চতুর্থ ভাইরাভাই শিপলু একটি ব্যাংকে কর্মরত। কর্মব্যস্ত জীবনে এই বাগানটি তার কাছে কেবল বাড়তি আয়ের উৎস নয়, বরং মানসিক প্রশান্তির এক অনন্য জায়গা। শিপলু বলেন, “সপ্তাহের পাঁচ দিন ব্যাংকের কাজের চাপ থাকে। সপ্তাহে অন্তত এক দিন বাগানে আসার চেষ্টা করি। এখানে এলে মনটা ভালো হয়ে যায়। সবুজ গাছপালা আর প্রকৃতির পরিবেশ কাজের ব্যস্ততা ও মানসিক চাপ অনেকটাই কমিয়ে দেয়।”
তৃতীয় ভাইরাভাই রাহাত খানও একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। ছুটিতে বাড়িতে এলেই তিনি বাগানে সময় কাটান। তিনি বলেন, “বিভিন্ন ছুটিতে বাড়িতে এলে বাগানে আসি। ফলের গাছ, সবুজ পরিবেশ সবকিছুই ভালো লাগে। এর পাশাপাশি বাড়তি একটি আয় হচ্ছে। চাকরির পাশাপাশি কৃষিতে যুক্ত থাকার বিষয়টি আমাদের জন্য আনন্দের।”
উদ্যোক্তা মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা চাকরির পাশাপাশি কৃষিকে বাড়তি আয়ের একটি উৎস হিসেবে দেখেছিলাম। কিন্তু এখন এটি শুধু ব্যবসা নয়, আমাদের ভালো লাগারও জায়গা। একটি পতিত জমিকে আমরা উৎপাদনশীল সম্পদে পরিণত করতে পেরেছি। নিজেদের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “কৃষিতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা থাকলে চাকরিজীবীরাও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। দেশে ফলের উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে ফলের চাহিদা মেটানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।”