নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কৈমারী ইউনিয়নের শৌলমারী সুনগর গ্রামের বাসিন্দা খাদিজা আক্তার (৫৫)। বর্তমানে তিনি জেলার অন্যতম সফল নারী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ লড়াই এবং অদম্য মানসিক শক্তির গল্প। ২০১৩ সালের নভেম্বরে তাঁর সাজানো সংসারে নেমে আসে চরম অন্ধকার। হৃদরোগে আক্রান্ত হন ব্যবসায়ী স্বামী নজরুল ইসলাম। অস্ত্রোপচারের মাসখানেক পর তাঁর খাদ্যনালিতে টিউমার ও ক্যানসার ধরা পড়ে। স্বামীর চিকিৎসার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালের ২৯ মে ইন্তেকাল করেন নজরুল ইসলাম।
স্বামী যখন মারা যান, তখন বড় ছেলে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে এবং ছোট ছেলে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছিলেন। দুজনই রংপুরে পড়াশোনা করছিলেন। বাবাকে হারানোর শোক এবং ভেঙে পড়া সংসার নিয়ে সেদিন থেকেই শুরু হয় খাদিজার একার লড়াই। স্বামীর মৃত্যুর পর কৈমারী বাজারে থাকা স্টেশনারি দোকান ও সংসার সামলাতে গিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়েন তিনি। দোকানে বসলে অনেক সময় নানাজনের কটু কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে। তবে তিনি দমে যাননি, বরং দৃঢ় সংকল্প নিয়ে দোকানটি চালিয়ে গেছেন। কারণ, স্বামীর স্বপ্ন ছিল ছেলেদের মানুষ করা, আর সেই স্বপ্ন পূরণের তাড়না তাঁকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
সম্প্রতি খাদিজার বাড়িতে গেলে দেখা যায় এক মনোরম পরিবেশ। বাড়ির প্রবেশপথে মাচায় প্যাশন ফ্রুটের লতা। একদিকে পুকুর, অন্যদিকে বিস্তৃত ফলের বাগান। আঙিনায় লিচু, আম, তেজপাতা ও তেঁতুলসহ নানা প্রজাতির গাছ। মাচায় ঝুলছে বাসরলতার ফুল। এক পাশে আয়তাকার কয়েকটি কংক্রিটের হাউসে রঙিন মাছের পোনা। আঙিনায় রামবুটান, কফি ও কোকোগাছের চারা। বাড়ির পেছনের দরজা পেরোলেই চোখে পড়ে কফি, রামবুটান ও ড্রাগন ফলের বাগান।
কফি চাষের শুরুটা ছিল খুব সহজভাবে। খাদিজা বলেন, “আমি কফি খেতে পছন্দ করি। বড় ছেলে একদিন বলল, বাড়ির পাশের পতিত জমি পরিষ্কার করে কফির চারা লাগানো যায় কি না। আমি সায় দিই।” এরপর ঝোপজঙ্গল পরিষ্কার করে কিশোরগঞ্জ উপজেলা থেকে অ্যারাবিকা জাতের কফির চারা নিয়ে আসেন তিনি ও তাঁর ছেলে। ২০১৮ সালে শুরু হয় কফি চাষ। পরবর্তীতে একে একে লাগানো হয় রামবুটান, কোকো, ড্রাগন ও প্যাশন ফ্রুটের চারা। তিন বছরের মধ্যেই এসব গাছে ফলন আসতে শুরু করে। একই সঙ্গে কংক্রিটের হাউসে রঙিন মাছের পোনা চাষ শুরু করেন তিনি।
খাদিজার মোট পাঁচ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে এক বিঘায় বাড়ি ও পুকুর এবং বাকি দুই বিঘায় কফি চাষ। আরও দুই বিঘায় ড্রাগন, রামবুটান, প্যাশন ফ্রুট ও কোকোসহ বিভিন্ন গাছ লাগানো হয়েছে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি কফি বাজারজাত করছেন। প্রতি কেজি কফি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। রামবুটানের ১০টি গাছে ফলন হচ্ছে, যার কেজি মূল্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। গত বছর তিনি ৪০০ কেজি রামবুটান বিক্রি করেছেন। এ বছর তিনটি গাছে ৮০ কেজি ফলন পাওয়া গেলেও বাকি সাতটি গাছে ফলন হয়নি। এছাড়া এ বছর রঙিন মাছের পোনা বিক্রি করে ৫ হাজার টাকা আয় করেছেন তিনি।
খাদিজার ভাষ্যমতে, সব খরচ বাদ দিয়ে ফল ও চারা বিক্রি করে মাসে তাঁর আয় প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বর্তমানে তাঁর বাগানে ২ হাজার ৫০০ কফির চারা, ৩০০টি রামবুটানের চারা এবং ২০০টি কোকোর চারা রয়েছে। বাগান থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি আরও ৭৫ শতক জমি কিনেছেন।
স্বামীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে গিয়েই তিনি সন্তানদের পড়াশোনায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। আত্মীয়স্বজনরা একসময় পরামর্শ দিয়েছিলেন অন্তত এক ছেলেকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে, কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। খাদিজা বলেন, “মারা যাওয়ার আগে আমার স্বামী বলে গিয়েছিলেন, ছেলেদের নিয়ে তাঁর অনেক স্বপ্ন ছিল, কিন্তু তাদের জন্য কিছু করে যেতে পারলেন না। আমি যেন পারলে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করি। আমি স্বামীর কথা রেখেছি। এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।”
তাঁর বড় ছেলে মো. আখতারুজ্জামান নর্দার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ শেষ করে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। ছোট ছেলে সেফায়েত নাসরাত ২০২৫ সালে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। চাকরির চেষ্টার পাশাপাশি তিনি মায়ের বাগানে সময় দেন এবং অনলাইনে ফল ও চারা বিক্রির কাজ পরিচালনা করেন। খাদিজার একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে, যা সেফায়েতই পরিচালনা করেন।
বাগান পরিচর্যার ফাঁকে সেফায়েত বলেন, “আমি অ্যাগ্রিকালচার (কৃষি) নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেছি। আমার অবসর সময় মায়ের গড়ে তোলা বাগানে দিচ্ছি। অনলাইনে ফল ও চারা বিক্রিতেও কাজ করছি। বাগান পরিচর্যার ক্ষেত্রে যতটুকু সহযোগিতা দরকার, সেটা আমি দিই। আগামী দিনে আমাদের বাগান আরও এগিয়ে যাবে—এটাই আমার প্রত্যাশা।”
নিজের কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে খাদিজা বলেন, “আমি অনেক পরিশ্রম করেছি। আমার সন্তান, আমার ব্যবসা—সবই সামলিয়েছি।”
তাঁর এই অদম্য প্রচেষ্টা স্বীকৃতি পেয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ে। ২০২৬ সালে জেলায় সেরা নারী কৃষি উদ্যোক্তার পুরস্কার পান খাদিজা। এছাড়া ২০২২ সালে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে রঙিন মাছের পোনা উৎপাদনে সম্মাননা লাভ করেন তিনি।
কৈমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাদেকুল সিদ্দিক বলেন, খাদিজা আক্তার একজন সংগ্রামী নারী। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার, ব্যবসা, ছেলেদের লেখাপড়া—সবই একা সামলেছেন। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেক বাড়িতে দেশি-বিদেশি ফলের চাষ করছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মণ্ডল জানান, খাদিজার আগ্রহ দেখে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে পরামর্শ দেওয়া এবং উপকরণ, চারা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁকে দেখে অন্য নারী-পুরুষেরাও উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অন্য উদ্যোক্তাদেরও একইভাবে সহযোগিতা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।