কৃষিকে কেবল জীবনধারণের উপায় নয়, বরং একটি লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করার স্বপ্ন দেখেছিলেন উদ্যোক্তা মো. মনিরুজ্জামান। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে মাত্র ২৫০টি মাল্টা গাছ রোপণের মাধ্যমে শুরু করেন তিনি তার ফলের বাগান। সময়ের সাথে সাথে তিনি তার এই উদ্যোগের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছেন। মাল্টার পাশাপাশি বাগানে যুক্ত করেছেন কমলা এবং ফলের বাগানের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেছেন আধুনিক পদ্ধতিতে সবজি চাষ।
পরিকল্পিত চাষাবাদ, মালচিং পদ্ধতি এবং আধুনিক সেচ প্রযুক্তির সমন্বয়ে বর্তমানে চার বিঘা জমির খামার থেকে বছরে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা লাভ করছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার এই কৃষি উদ্যোক্তা।
মনিরুজ্জামানের বাড়ি ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া সাতজান গ্রামে। কৃষিখাতে নতুন কিছু করার প্রবল আগ্রহ থেকেই ২০১৭ সালে তিনি মাল্টার বাগান গড়ে তোলেন। শুরুতে ২৫০টি মাল্টা গাছ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে বাগানে কমলা গাছ যুক্ত করেন তিনি। তবে তিনি শুধু ফলের ওপর নির্ভর করে থাকতে চাননি, বরং একই জমিতে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরির কথা ভেবেছেন। সেই ভাবনা থেকেই ২০২৫ সালে তিনি মালচিং পদ্ধতিতে মৌসুমি সবজি চাষ শুরু করেন।
বর্তমানে তার চার বিঘা জমিতে একই সঙ্গে মাল্টা, কমলা এবং বিভিন্ন মৌসুমি সবজির উৎপাদন চলছে। ফলের বাগানের পাশাপাশি সবজি চাষের মাধ্যমে তিনি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। বিশেষ করে বছরে চার দফায় শসা চাষ তার এই উদ্যোগকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। মৌসুম অনুযায়ী শসার পাশাপাশি অন্যান্য সবজিও উৎপাদন করছেন তিনি।
মনিরুজ্জামানের খামারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ। সবজি চাষে তিনি মালচিং পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। এই পদ্ধতিতে জমির বেড বিশেষ পলিথিনের আবরণ দিয়ে ঢেকে চাষ করা হয়, যার ফলে মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে, আগাছা নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং পরিচর্যার খরচ কমে আসে। পাশাপাশি স্প্রিংকলার সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে বৃষ্টির মতো পানি ছিটিয়ে ফসলে সেচ দিচ্ছেন তিনি। এতে জমিতে পানির সুষম ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সেচের শ্রমও হ্রাস পেয়েছে।
উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে তিনি বাগানের মাল্টা প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং কমলা প্রায় ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। অন্যদিকে, শসা ও অন্যান্য মৌসুমি সবজি বিক্রি থেকেও আসছে নিয়মিত আয়। ফল ও সবজি উৎপাদন, পরিচর্যা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বছরে তার নিট লাভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা।
একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের এই কৌশলের ফলে তার আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সারা বছর খামারটি উৎপাদনমুখী থাকছে। একটি ফসলের মৌসুম শেষ হলে অন্য ফসল থেকে আয় আসার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একক ফসল নির্ভরতার ঝুঁকি কমিয়ে তিনি একটি বহুমুখী কৃষি উদ্যোগ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
তবে এই সাফল্যের পেছনে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি কৃষি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ছিল। বাগান প্রতিষ্ঠার সময়ে কৃষি বিভাগ থেকে তিনি মাল্টার চারা, সার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পেয়েছেন। পাশাপাশি পেয়েছেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা। সরকারি এই সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে মনিরুজ্জামান তার উদ্যোগকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
গত রোববার (১ নভেম্বর) তার খামার পরিদর্শন করেন ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান। পরিদর্শনকালে তারা মাল্টা ও কমলার ফলন, মালচিং পদ্ধতিতে সবজি চাষ এবং স্প্রিংকলার সেচব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে ঘুরে দেখেন।
ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কৃষক মনিরুজ্জামান একই জমিতে মাল্টা, কমলা ও বিভিন্ন মৌসুমি সবজি চাষ করে একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশেষ করে মালচিং পদ্ধতি ও আধুনিক সেচ প্রযুক্তির ব্যবহার তার উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করেছে। জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ ধরনের বহুমুখী চাষাবাদ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি বিভাগ থেকে তাকে মাল্টার চারা, সার, অন্যান্য উপকরণ এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। এলাকার অন্য কৃষকদেরও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে লাভজনক চাষাবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মনিরুজ্জামানের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। চার বিঘা জমিতে পরিকল্পিতভাবে মাল্টা, কমলা ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। তার এ উদ্যোগ অন্য কৃষকদের জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, ফসলের বৈচিত্র্য ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ সম্প্রসারণে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ কৃষকদের উৎসাহিত করবে।”