নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার মতির বাজার-খগারহাট সড়কটির করুণ দশা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার করা হয়নি, যার ফলে রাস্তার বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত ও ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। এই সড়কটি কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের প্রধান যাতায়াতের পথ হওয়ায় তারা বর্তমানে চরম ভোগান্তির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

সড়কটির ভৌগোলিক অবস্থান লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এর পূর্ব প্রান্তে গয়াবাড়ী ইউনিয়নের মতির বাজার ও শুটিবাড়ী হাট অবস্থিত। অন্যদিকে, পশ্চিম প্রান্তে খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের খগারহাট হয়ে সড়কটি পাগলাপীর-পশ্চিম ছাতনাই আঞ্চলিক সড়কের সাথে সংযুক্ত। এই রাস্তার দুই পাশে গড়ে উঠেছে একাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মাদ্রাসা, বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং কিন্ডারগার্টেন। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের এই পথটি ব্যবহার করতে হয়। ফলে শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে এই সড়কটি স্থানীয়দের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়কের বিভিন্ন জায়গায় পিচ উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় কার্পেটিং ও খোয়া উঠে গিয়ে নিচের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। এসব গর্তের কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চালক ও যাত্রীরা প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, ভ্যান, নছিমন ও করিমন চালকদের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্ষাকালে গর্তগুলোতে পানি জমে থাকায় রাস্তার ভাঙাচোরা অংশগুলো চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সড়কের এই জরাজীর্ণ অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কৃষক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম সংকটে পড়েছেন। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ পরিবহনে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করছেন। রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে যানবাহনের ভাড়া ও যাতায়াতের সময়—উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, “কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ নিয়মিত এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করেন। সড়ক খারাপ হওয়ায় অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নছিমন, করিমন ও অটোরিকশাচালকদেরও নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। জনদুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা প্রয়োজন।”

কৃষক আব্দুল জলিল তার কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, “সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভাঙাচোরা সড়কে পণ্য পরিবহনে সময় বেশি লাগছে, পাশাপাশি পরিবহন খরচও বাড়ছে। এতে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে সমস্যা হচ্ছে।” তিনি দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানান।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আদাবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক জাকিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও ভাঙন থাকায় তাদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাই দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা প্রয়োজন।”

উত্তর গয়াবাড়ী পুলেরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নয়ন তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলে, “সড়কের বিভিন্ন জায়গায় গর্ত ও ভাঙন থাকায় সাইকেল নিয়ে চলাচল করতে সমস্যা হয়। একটু অসতর্ক হলেই পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সড়কটি সংস্কার করা হলে আমাদের যাতায়াত সহজ হবে।”

গয়াবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শরীফ ইবনে ফয়সাল মুন এই সড়কের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, “সড়কটি কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর বেহাল অবস্থার কারণে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহন এবং অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে।” তিনি জনস্বার্থে সড়কটি দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

সড়কের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান জানান, সড়কটির অবস্থা খতিয়ে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “সড়কটি কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সংস্কারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”