এক বছর ধরে ঝুলে থাকা রংপুর নগরীর ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত সড়ক সংস্কারের কাজ এখন হঠাৎ করেই গতি পেয়েছে। প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর অজ্ঞাত কারণে দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল এই সংস্কারকাজ। ফলে ভাঙা রাস্তা এবং উড়ন্ত ধুলাবালিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরের আগ মুহূর্তে গত কয়েক দিনে এই কাজ জোরেশোরে শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র চার দিনে সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ অনেকটাই এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, যে কাজ কয়েক দিন বা সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল, তা দীর্ঘ সময় ঝুলিয়ে রেখে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টির দায়ভার কে নেবে?

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে রংপুর নগরীর ডিসির মোড় এলাকায় সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত ১ হাজার ১৮০ মিটার সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে।

রংপুর সিটি করপোরেশনের সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ও নিজস্ব তহবিল থেকে এই সড়ক এবং সংলগ্ন আরসিসি ড্রেন সংস্কারের জন্য মোট ১৭ কোটি ৮৫ লাখ ১২ হাজার ১২৩ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। গত বছরের ১৩ অক্টোবর ঠিকাদার খায়রুল কবির রানাকে এই কাজের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত কার্যাদেশ অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ২০২৫ থেকে শুরু করে ৪৫৫ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে সড়কটির প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। সড়কের পুরোনো কার্পেটিং তুলে ফেলা হলেও নতুন কার্পেটিং না করায় রাস্তাটি খানাখন্দে পরিণত হয়। নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েন পথচারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী এবং যানবাহনের চালকেরা।

সোমবার দুপুরে প্রতিবেদকের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সড়কটিতে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। ঠিকাদার খায়রুল কবির রানার পক্ষে তদারকির দায়িত্বে থাকা এক ব্যক্তি জানান, কার্পেটিংয়ের কাজ করছেন উপঠিকাদার আব্দুর রাজ্জাক। গত চার-পাঁচ দিন ধরে এই কাজ অত্যন্ত দ্রুত গতিতে চলছে। দ্রুত কাজ শেষ করার লক্ষ্যে রাতেও সার্চলাইট ব্যবহার করা হচ্ছে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, সোমবারের মধ্যেই কার্পেটিংয়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে এক বছর ধরে এই কাজ কেন ঝুলে ছিল, সে বিষয়ে জানতে ঠিকাদার খায়রুল কবির রানার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

রংপুর মহানগরীর হারাগাছ এলাকার ব্যবসায়ী শিমুল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত এক বছর ধরে ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত রাস্তার কাজ ঝুলে ছিল। প্রধানমন্ত্রী আসার খবরে যে কাজ সাত দিনের মধ্যে করা সম্ভব হলো, সেটি গত এক বছরে কেন করা সম্ভব হলো না? স্কুল-কলেজে যাওয়া, বাজার করাসহ নানা কাজে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। জনগণের এই ভোগান্তির দায়ভার কে নেবে?”

রংপুর প্রেসক্লাব মার্কেটের ব্যবসায়ী রুস্তম আলী বলেন, “সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল এক বছর আগে। এত দিনে ঠিকাদার রাস্তার ৫০ শতাংশ কাজও করতে পারেননি। অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুরে আসার খবরে রাতারাতি কাজ হচ্ছে। সড়কটি কতটা টেকসই হবে, সেটিও ভাবার বিষয়।”

ডিসির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক নাজমুল বলেন, “গত এক বছর ধরে রাস্তাটি ভাঙাচোরা ছিল। এখানে যানজটে আটকে থাকতে হয়। কোনো কোনো যাত্রী রিকশা থেকে নেমে হেঁটে চলে যান। এক বছর পর রাতারাতি রাস্তা ঠিক হয়ে গেল। কারণ, তারেক রহমান আসতেছেন। যাই হোক, রাস্তা ঠিক হচ্ছে, এটা নিয়েই খুশি।”

রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত সড়কের কাজ এক বছর ধরে ঝুলে ছিল। প্রধানমন্ত্রীর সফরের খবরে এখন তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করা হচ্ছে। এই এক বছরে পথচারীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। যে কাজ সাত দিন বা এক মাসে করা সম্ভব, সেটি করতে এক বছর লাগল কেন? এই সময়ে মানুষের যে ভোগান্তি হয়েছে, তার দায় কে নেবে?”

তিনি আরও বলেন, “শুধু প্রধানমন্ত্রীকে দেখানোর জন্য তড়িঘড়ি করে কাজ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কাজের মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষ চাইলে যে দ্রুত সড়ক সংস্কার করা সম্ভব, এটি তার উদাহরণ। কিন্তু জবাবদিহির অভাবে মানুষকে দিনের পর দিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।”

রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) আবু তৈয়ব মো. শামসুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে জানান, সোমবার রাতের মধ্যে সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ ৮০ শতাংশ শেষ হবে। ড্রেন নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে দুই পাশে ফুটপাতের টাইলস, কিছু কার্বস্টোন ও আলোকসজ্জার কাজ এখনো বাকি রয়েছে।

কার্পেটিংয়ের কাজ আগে শেষ করা যেত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আগেই কাজটি করা উচিত ছিল। আমরা কাজের প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সফরের তারিখ দেওয়ায় কাজটি দ্রুত শুরু হয়েছে। সড়কের মান নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। কার্বস্টোন বসিয়ে ফিনিশিং দিতে পারলে আরও ভালো হতো। একটু তাড়াহুড়া করতে হচ্ছে। আরও দু-এক দিন সময় পেলে কাজটি আরও ভালোভাবে করা যেত। কিছু জায়গায় কার্বস্টোন বসানো বাকি থাকবে, সেগুলো পরে করা হবে।”

প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে নগরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযানও চলছে। রংপুর সিটি করপোরেশনের সহকারী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা (অঞ্চল-১) মিজানুর রহমান মিজু মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সিটি মোড় থেকে সিও বাজার হয়ে সার্কিট হাউসের সামনে দিয়ে সিটি করপোরেশন কার্যালয় হয়ে শাহী মসজিদের পূর্ব পাশ পর্যন্ত বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চলছে। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। রাতে সড়ক ও ফুটপাত ধুয়ে দেওয়া হবে, যাতে ধুলাবালি না থাকে। সড়ক বিভাজকেও রং করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গতকাল ও সোমবার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালানো হয়েছে। সোমবার কাচারিবাজার এলাকায় এই অভিযান পরিচালিত হয়।

গত ১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তারেক রহমানের রংপুর সফরের সময়সূচি প্রকাশ করা হয়। সূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৯টায় তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা প্রধানমন্ত্রীর। এরপর তিনি রংপুর নগরীর রাধাগোবিন্দ মন্দিরে ধর্মসভায় যোগ দেবেন। বেলা ১১টার দিকে মন্দিরটি পরিদর্শন শেষে সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে তার। সফর উপলক্ষে পুরো নগরীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সাজানোর কাজ চলছে।