স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে ৫৫ বছরে এসেও উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জনপদ রংপুর সিটি করপোরেশন। দীর্ঘদিনের অনুন্নত সড়ক, জলাবদ্ধতা, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু-কালভার্ট এবং নাগরিক অবকাঠামোর তীব্র সংকটের মাঝে এবার রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য এল বড় সুখবর। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নগরীর অবকাঠামো উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পুনর্বাসনে মোট ১ হাজার ৮১৩ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার টাকার দুটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।

গত বুধবার (৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত একনেক সভায় রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৯ লাখ ৩ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসন’ প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২১০ কোটি ৪৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি, নাগরিক দুর্ভোগ এবং বরাদ্দের বৈষম্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসা রংপুরবাসীর কাছে এই সিদ্ধান্ত নতুন আশার আলো হয়ে দেখা দিচ্ছে। তবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, কেবল বরাদ্দ অনুমোদনই যথেষ্ট নয়; প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু করা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা এবং অর্থের সর্বোচ্চ স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

একনেকে অনুমোদিত ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৯ লাখ ৩ হাজার টাকার প্রকল্পটি রংপুর নগরীর সড়ক ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। এই প্রকল্পের আওতায় নতুন করে ১৮৬ দশমিক ১৭ কিলোমিটার অ্যাসফল্ট সড়ক নির্মাণ, ১৩৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার অ্যাসফল্ট সড়ক সংস্কার এবং ১১৮ দশমিক ৬৪ কিলোমিটার সড়ক মেরামত ও প্রশস্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩১ দশমিক ৬০ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক নির্মাণ করা হবে।

নগরীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সংকট নিরসনে প্রকল্পের আওতায় ১৪৫ দশমিক ৩১ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন এবং ৫৫ দশমিক ৯৯ কিলোমিটার সড়কসহ ড্রেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ২২টি সেতু নির্মাণ করা হবে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা সেতু ও কালভার্টের বিষয়টি এই প্রকল্পটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে রংপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ সেতু ও কালভার্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

অন্য প্রকল্পটির আওতায় ২১০ কোটি ৪৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা ব্যয়ে রংপুর সিটি করপোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পুনর্বাসন করা হবে। এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো সড়ক প্রশস্তকরণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নগরীর সড়ক নেটওয়ার্ক উন্নত করা, যাতে যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল সহজ হয় এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়।

দুটি প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়ন হলে নগরীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা একসাথে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। নতুন সড়ক নির্মাণ ও পুরোনো সড়ক সংস্কারের পাশাপাশি ড্রেনেজ অবকাঠামো বৃদ্ধি এবং সেতু নির্মাণের ফলে যোগাযোগ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক প্রতিনিধিদের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে সড়ক নির্মাণ না করে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার সঙ্গে এসব প্রকল্পের সমন্বয় করা প্রয়োজন।

স্বাধীনতার পর থেকেই রংপুর অঞ্চল উন্নয়ন বরাদ্দে পিছিয়ে থাকার অভিযোগ করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বাজেট বিশ্লেষণ ও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিল্পায়ন, যোগাযোগ, কৃষিভিত্তিক শিল্প, কর্মসংস্থান, নদী ব্যবস্থাপনা ও নগর অবকাঠামোতে রংপুর প্রত্যাশিত বিনিয়োগ পায়নি।

বিশেষ করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে রংপুর সিটি করপোরেশনের জন্য কোনো উন্নয়ন বরাদ্দ না থাকার বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এর আগের দুই অর্থবছরে রংপুর সিটির উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল যথাক্রমে প্রায় ২০ কোটি ৯৪ লাখ ও ১৭ কোটি ৭ লাখ টাকা, যেখানে একই সময়ে অন্যান্য বড় সিটি করপোরেশনের জন্য বরাদ্দ ছিল কয়েকশ থেকে হাজার কোটি টাকা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়েও রংপুরের নাগরিক সমাজ ও ব্যবসায়ী মহলে হতাশা তৈরি হয়েছিল। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু তখন বলেছিলেন, “রংপুরে শিল্পায়ন, তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বন্ধ চিনিকল চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোতে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখা যায়নি।” তিনি রংপুরকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় উন্নয়ন বরাদ্দে পিছিয়ে থাকা অঞ্চল হিসেবেও উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে বড় বড় জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পের তুলনায় রংপুর অঞ্চলে বড় বিনিয়োগের ঘাটতি ছিল। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যের পরিস্থিতির ওপর।

রংপুর সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরপিইউজে) সাধারণ সম্পাদক এবং যমুনা টেলিভিশনের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট সাংবাদিক সরকার মাজহারুল মান্নান বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে রংপুরের উন্নয়ন বৈষম্য ও নাগরিক সংকট নিয়ে কথা বলেছি, রংপুরবাসী দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের ন্যায্য অংশ পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারের সময়ে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এলেও রংপুরের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের মতো বড় ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।” এবার যে বড় বরাদ্দ এসেছে, সেটিকে তিনি রংপুরের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতি পূরণের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রকল্প অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা হলে সেই প্রত্যাশা আবারও হতাশায় পরিণত হবে। তাই কাজের মান, স্বচ্ছতা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সুজনের রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, “রংপুরের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা শুধু সড়ক বা নগর অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, নদী ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “বড় বরাদ্দ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু বরাদ্দ কত হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রংপুরের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমান্তরাল উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”

রংপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, রংপুরের উন্নয়নে সুষম বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। তিনি বলেন, “জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন পৌঁছে দিতে হবে আমরা কাজ করছি। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা কাটাতে পরিকল্পিত ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করবে বর্তমান সরকার।”

রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক সামসুজ্জামান সামু বলেন, নগরবাসীর উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খালের উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, “একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।” রাস্তা নির্মাণ, পানি নিষ্কাশন, খাল, পরিবেশ, ভূমি ব্যবহার ও ভবিষ্যৎ নগর সম্প্রসারণ বিবেচনায় নিয়ে তিনি নগরবাসীর সহযোগিতাও চান।

রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব, অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন বলেন, রংপুরকে পরিবেশবান্ধব, আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত মহানগর হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ চলছে। অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে গুণগত মান নিশ্চিত করতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও তিনি জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শতভাগ গুণগত মান বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারির কথাও বলেছেন তিনি।

একনেকে অনুমোদিত বড় প্রকল্পগুলোকে তিনি নগরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে রাস্তা, ড্রেন, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে রংপুরের নাগরিক দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।

রংপুরের জন্য একনেকের এই ১ হাজার ৮১৩ কোটি ২৮ লাখ ৩১ হাজার টাকার দুটি প্রকল্প নিঃসন্দেহে নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ। এর আগে রংপুর বিভাগের উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক উন্নয়নের জন্যও প্রায় ৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ঘাটতির প্রেক্ষাপটে এসব প্রকল্প রংপুরের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। তবে এখন রংপুরবাসীর প্রত্যাশা একটাই—বরাদ্দ যেন কাগজে আটকে না থাকে, প্রকল্প যেন বছরের পর বছর ঝুলে না থাকে এবং উন্নয়নের প্রতিটি টাকা যেন দৃশ্যমান জনকল্যাণে ব্যয় হয়।

দীর্ঘ বঞ্চনার পর একনেকের এই বড় বরাদ্দ তাই শুধু একটি প্রকল্প অনুমোদনের খবর নয়, রংপুরবাসীর কাছে এটি উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের একটি বড় প্রত্যাশা। এখন সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।