জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক সভায় ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ মোট ১৩টি প্রকল্প অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের সামগ্রিক বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ২০৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থায়নের বিস্তারিত তথ্যে জানা গেছে, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১০ হাজার ৬০০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এছাড়া প্রকল্প ঋণ হিসেবে বরাদ্দ করা হয়েছে ৪ হাজার ৮১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় হবে ১ হাজার ৫২৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা।

বুধবার (৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুমোদিত মোট ১৩টি প্রকল্পের মধ্যে ১০টি সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প, দুটি সংশোধিত এবং একটি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, শিল্প, বস্ত্র ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানি সম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকিব। এছাড়া সভায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও অংশ নেন।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্কের ব্যয় ধরা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নগর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় সংশোধনে। এই প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৩১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বৃদ্ধি করে মোট ৭ হাজার ৩৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৪১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় সংশোধনে তা বেড়ে হয় ৫ হাজার ৭২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সর্বশেষ এই সংশোধনে আরও ১ হাজার ৩১০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে।

গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়নে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও নওগাঁ জেলার জন্য ৩ হাজার ৭৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে, যার সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে সরকার। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের লক্ষ্যে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ১ হাজার ৯৫৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে।

বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে রামপালে ৪৪২ মেগাওয়াট পিক সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ২ হাজার ৪৯৮ কোটি ৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর অর্থায়নের মধ্যে প্রকল্প ঋণ ও অনুদান থেকে আসবে ২ হাজার ১২৩ কোটি ৩৬ লাখ ৭৪ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ব্যয় হবে ৩৭৪ কোটি ৭১ লাখ ১৯ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৯ সালের মার্চ পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১ থেকে ৮ নম্বর জোনের রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাত নির্মাণের জন্য ২ হাজার ৫৮৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ১৯৮ কোটি ৯৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়ন ৩৮৮ কোটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ধরা হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ৭৮৪ কোটি ৪৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৫৪৯ কোটি ১৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ডিএসসিসির নিজস্ব অর্থায়ন ২৩৫ কোটি ৩৪ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৭৯ লাখ ৩ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১২১ কোটি ৯৫ লাখ ৩২ হাজার টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮০ কোটি ৮৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। এছাড়া রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা পুনর্বাসনে আরও ২১০ কোটি ৪৯ লাখ ২৮ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৬৮ কোটি ৩৯ লাখ ৪২ হাজার টাকা এবং সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়ন ৪২ কোটি ৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) জন্য ৩৫টি বাণিজ্যিক ও ৮টি সহায়ক জলযান সংগ্রহ এবং দুটি নতুন স্লিপওয়ে নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন অনুমোদন করা হয়েছে। এতে ব্যয় ৭৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ২ হাজার ১৬৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ২ হাজার ৬০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১০৮ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। একই সঙ্গে প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত চ্যান্সারি ভবনটি ব্যবহারোপযোগী করতে সংস্কার ও আধুনিকায়নের জন্য ২১১ কোটি ৩০ লাখ টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।

পঞ্চগড়ের ভজনপুর থেকে পঞ্চগড় সড়কের ১৫তম কিলোমিটারে দ্বিতীয় করতোয়া সেতু নির্মাণে ২০৩ কোটি ৫২ লাখ ৬৬ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে এই প্রকল্পটি ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে।

থানচি-রিমাকরি-মদক-লিকরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনও অনুমোদন করা হয়েছে। এতে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, ফলে প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯২৬ কোটি ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকা। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৪৬৯ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। প্রথম সংশোধনে ব্যয় বেড়ে ৮৫৩ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় সংশোধনে ৮৮৯ কোটি ৬২ লাখ ৩২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবার আরও ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির মেয়াদ চতুর্থবার বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সমবায়ের মাধ্যমে ১৮৪ কোটি ৮৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকার নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পটি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রীর মাধ্যমে ইতোমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের একটি প্রকল্প সম্পর্কে একনেককে অবহিত করা হয়েছে। এর মধ্যে জয়পুরহাট জেলার নন্দাহার, হারাবতী নদী, নুনগোলা খাল এবং খাড়োয়া খাল পুনঃখনন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।