বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের বাসিন্দা সুমন আহমেদ এখন কেবল একজন সফল কৃষকই নন, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন অনেক নতুন কৃষি উদ্যোক্তার অনুপ্রেরণা। প্রবাসে রংমিস্ত্রির কাজ করে সঞ্চিত অর্থ দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল সমন্বিত কৃষি খামার, যেখানে মাছ চাষের পাশাপাশি উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত জাতের সবজির চারা।
এই সাফল্যের গল্পের পেছনে রয়েছে শৈশবের এক করুণ স্মৃতি। সুমন আহমেদ যখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন, তখন তাঁর বাবা আবদুল হামিদ হাওলাদার অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করতেন। একবার একটি জমিতে ডাল চাষের পর বর্গার ভাগ রেখে জমির তিন মালিকের প্রাপ্য ডাল সমান করে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন সুমন ও তাঁর বাবা। কাঁধে ডালের বস্তা নিয়ে সুমনও ছিলেন বাবার সঙ্গে। তবে তিন মালিকের একজনের বাড়িতে ডাল পৌঁছে দেওয়ার পর অভিযোগ ওঠে যে, তাঁকে ডাল কম দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় সুমনের বাবাকে তীব্র ভর্ৎসনা করা হয়। সেই ঘটনাটি কিশোর সুমনের মনে গভীর রেখাপাত করে। সেদিনই তিনি মনে মনে সংকল্প করেছিলেন, একদিন তিনি অবশ্যই নিজের জমির মালিক হয়ে কৃষক হবেন।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ৭২ বছর বয়সে সেই শৈশবের সংকল্প পূরণ করেছেন সুমন। যে জমিতে তাঁর বাবা একসময় বর্গা চাষ করতেন, সেই জমিটিই তিনি কিনে নিয়েছেন। বিদেশে রংমিস্ত্রির কাজ করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে সেখানে গড়ে তুলেছেন সমন্বিত কৃষি খামার। বর্তমানে তিনি পেঁপে, বেগুন, ধুন্দুল, মিষ্টিকুমড়া ও মাছ চাষের পাশাপাশি পেঁপে ও বিভিন্ন সবজির চারা উৎপাদন করছেন।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান সুমন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও অর্থের অভাবে আর সামনে এগোতে পারেননি। পরিবারের হাল ধরতে তিনি পাড়ি জমান ঢাকায়। সেখানে কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি, কখনো শ্রমিক, আবার কখনো রংমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এরপর ১৯৮২ সালে রংমিস্ত্রি হিসেবে কুয়েতের হুন্দাই কোম্পানিতে কাজের সুযোগ পান। কোম্পানির কাজেই পরবর্তীতে তিনি কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যান। সর্বশেষ ২০০৬ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান।
বিদেশে থাকাকালীন কৃষিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে শুরু করেন সুমন। তিনি লক্ষ্য করেন, জার্মানি ও চীনের মানুষ বড় বড় কৃষি খামার গড়ে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। সেখানে কৃষি কেবল জীবনধারণের উপায় নয়, বরং একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। কৃষি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে সুমন মালয় উপদ্বীপে যান। সেখানে বড় কৃষি খামার পরিদর্শনের সময় পেঁপে চাষ তাঁর বিশেষ নজর কাড়ে। বিশেষ করে ভারতীয় শাহি ও কাশ্মীরি জাতের পেঁপে দেখে তিনি মুগ্ধ হন। এই জাতের বীজ সংগ্রহ করতে তিনি কেরালার কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে তখন দেশে ফিরে চাষ করার মতো নিজস্ব জমি তাঁর ছিল না।
পৈতৃক বাড়িটুকু ছাড়া সুমনের পরিবারের তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। তাই বিদেশে উপার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে জমি কিনতে শুরু করেন। একসময় বাড়ির পাশে ১২৩ শতক এবং কিছুটা দূরে আরও ৫০ শতক জমি কেনেন তিনি।
২০১৯ সালে দেশে ফিরে তিনি এই জমিতে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। প্রথম পর্যায়ে একটি পুকুর খনন করেন এবং পুকুরের পাশে প্রায় একশটি পেঁপের চারা রোপণ করেন। পাশাপাশি পুকুরে মাছ চাষ শুরু করেন। ছোট পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগটিই সময়ের সাথে সাথে একটি বিশাল খামারে রূপ নিয়েছে।
বর্তমানে সুমনের দুটি খামারের মোট আয়তন ১৭৩ শতক। এর একটি খামারে প্রায় ১ হাজার ২০০টি পেঁপেগাছ ও তিনটি পুকুর রয়েছে। অন্য খামারে রয়েছে আরও ৪০০টি পেঁপেগাছ।
এবার পেঁপে বিক্রি করে সুমন ১৭ লাখ টাকা আয় করেছেন, যার মধ্যে অন্তত আট লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। খামারে আরও কিছু পেঁপে রয়েছে যা প্রায় ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব। তবে এই পেঁপে তিনি বিক্রি করবেন না; প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে যাঁরা খামারটি দেখতে আসেন, তাঁদের আপ্যায়নের জন্য তিনি এই পেঁপেগুলো রেখে দিয়েছেন। এছাড়া তিনি বেগুন, ধুন্দুল ও মিষ্টিকুমড়াও চাষ করছেন।
সুমনের মতে, তাঁর কৃষি উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখন চারা উৎপাদনে। এ বছর প্রায় ২০ লাখ পেঁপের চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। এরই মধ্যে ক্রেতাদের চাহিদামত সাড়ে চার লাখ চারা তৈরি করেছেন, যার প্রতিটি ৪০ টাকা দরে বিক্রি করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকেরা চারা কিনতে এবং চাষের কৌশল শিখতে এই খামারে ভিড় করেন। ভারত থেকে সংগ্রহ করা পেঁপের বীজের দাম কেজিপ্রতি ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
সুমন আহমেদ জানান, “এক কেজি বীজে ২১ হাজার চারা তৈরি করা যায়। আর প্রতিটি চারা বিক্রি করে তাঁর দুই টাকা লাভ থাকে।”
ধারাবাহিকভাবে সুমনের খামারের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে আয় হয়েছিল ৬ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১৫ লাখ এবং ২০২৫ সালে ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। চলতি বছর পেঁপে, সবজি, মাছ ও চারা বিক্রি করে আয় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে তিনি আশা করছেন।
ভারতীয় শাহি ও কাশ্মীরি জাতের বীজ থেকে চারা উৎপাদনের জন্য সুমন খামারে একটি বিশেষ সিডলিং হাউস তৈরি করেছেন। এই হাউসের ছাউনিতে উন্নত মানের ইউভি স্টেবিলাইজড পলিথিন ব্যবহার করা হয়েছে, যার মাধ্যমে ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বীজের অঙ্কুরোদ্গম এবং চারার প্রাথমিক বৃদ্ধির জন্য উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা অত্যন্ত সহায়ক। অত্যন্ত যত্ন সহকারে চারা উৎপাদনের ফলে তাঁর চারার মান ভালো হচ্ছে এবং দেশজুড়ে এর চাহিদা বাড়ছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ সুমনের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁকে একজন পরিশ্রমী ও উদ্ভাবনী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “উন্নত মানের পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি পুরো অঞ্চলের কৃষকদের উপকৃত করছেন। তাঁর এই উদ্যোগটি অনুকরণীয়।”
বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাহিদ বিন রফিক জানান, রোগমুক্ত ও উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের পেঁপের চারা উৎপাদন করায় সুমনের খামারের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে, ফলে সারা দেশে এসব চারার চাহিদা বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, বরিশালের স্থানীয় ও লবণাক্ত মাটিতেও তাঁর উৎপাদিত পেঁপের চারা ভালোভাবে মানিয়ে নেয় এবং ভালো ফলন দেয়।
গত বৃহস্পতিবার সুমনের খামারে পরিদর্শনে দেখা যায়, মূল ফটক পেরিয়ে সিডলিং হাউসে কয়েকজন নারী শ্রমিক ব্যস্ত। কেউ পলিথিনের ব্যাগে মাটি ভরছেন, কেউ বীজ বুনছেন, আবার কেউ বীজ বপন করা ব্যাগগুলো অঙ্কুরোদ্গমের জন্য ট্রেতে সাজিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখছেন। সামনে এগোলে দেখা যায়, পুকুরের ভেতরে তৈরি বৈঠকখানায় বসে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছেন সুমন। পুকুরের দুই পাড়ে সারি সারি পেঁপেগাছে প্রচুর ফল ধরেছে। বাগানে শ্রমিকরা কেউ বেডে পানি দিচ্ছেন, কেউ গাছের গোড়ার মাটি আলগা করছেন।
বর্তমানে সুমনের খামারে ১৫ জন শ্রমিক কর্মরত, যাদের মধ্যে ছয়জন নারী। নারী শ্রমিক জেসমিন আক্তার বলেন, “এই খামারে কাজ করে পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে।”
নিজে সফল হওয়ার পর সুমন অন্যদের সাহায্য করতেও পিছপা হননি। স্ত্রী দেলোয়ারা বেগমের নামে বায়লাখালী এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন ‘দেলোয়ারা কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’। সেখানে কৃষকদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। সুমনের দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় দুই হাজার মানুষকে তিনি বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাদের অনেকেই এখন কৃষিতে উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
কুমিল্লার লাকসাম থেকে পেঁপের চারা কিনতে আসা তরুণ উদ্যোক্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, “২০০টি চারা কিনেছি। এক দিন খামারে থেকে চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণও নিয়েছি।”