ইসলামি জীবনদর্শনে ঋণ গ্রহণ করাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। ঋণের গুরুত্ব এতটাই যে, একজন শহীদের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হলেও তার ঋণের দায়ভার ততক্ষণ পর্যন্ত মোচনে হয় না, যতক্ষণ না তা যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়। তবে বাস্তব জীবনে অভাব, আকস্মিক অসুস্থতা কিংবা ব্যবসায়িক ক্ষতির মতো প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে মানুষ অনেক সময় ঋণের জালে আটকা পড়ে যায়।

এই চরম দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতদের জন্য কিছু চমৎকার মানসিক, আধ্যাত্মিক এবং প্রায়োগিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।

ঋণমুক্তির ক্ষেত্রে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—যেকোনো উপায়ে পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করার জন্য মনে দৃঢ় সংকল্প বা নিয়ত রাখা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঋণ নেওয়ার পর মানুষ তা পরিশোধের কথা ভুলে যায় অথবা নানা অজুহাতে গড়িমসি করে। অথচ অন্তরে যদি পরিশোধের প্রকৃত তাগিদ থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা অদৃশ্যভাবে সাহায্য করেন।

এই বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ হিসেবে) গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৮৭)

পুনরাবৃত্তিমূলকভাবে বলা যায় যে, যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ (ঋণ হিসেবে) গ্রহণ করে তা পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে ব্যক্তি তা গ্রহণ করে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।

মানসিক দুশ্চিন্তা এবং ঋণের পাহাড় থেকে মুক্তির জন্য নবীজি (সা.) সাহাবীদের বিশেষ কিছু দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে, একবার হজরত আবু উমামা (রা.) ঋণের দায়ে অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে মসজিদে বসে ছিলেন। তখন নবীজি (সা.) তাঁকে প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় একটি বিশেষ দোয়া পড়ার নির্দেশ দেন।

দোয়াটি হলো: “আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়া আউজু বিকা মিনাল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া আউজু বিকা মিন গালাবাতুদ দাইনি ওয়া কহরির রিজাল।”

এর অর্থ হলো: “হে আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও বেদনা থেকে, আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে এবং আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঋণের বোঝা ও মানুষের দমন–পীড়ন বা আধিপত্য থেকে।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫৫৫)

এছাড়া হজরত আলী (রা.) এক চুক্তিবদ্ধ দাসকে ঋণমুক্তির জন্য নবীজির শেখানো আরেকটি কার্যকর দোয়া শিখিয়েছিলেন।

দোয়াটি ছিল: “আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াকা।”

এর অর্থ: “হে আল্লাহ, আপনার হারাম বস্তুর বদলে হালাল রিজিক দিয়ে আমাকে অভাবমুক্ত করুন এবং আপনার অনুগ্রহ দিয়ে আপনি ছাড়া অন্য সবার থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৬৩)

আধ্যাত্মিক দোয়ার পাশাপাশি বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত তার দৈনন্দিন জীবন থেকে সব ধরনের অপচয় এবং বিলাসিতা বর্জন করা।

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী দ্রুত ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। এজন্য নিজের ও পরিবারের মৌলিক প্রয়োজন যেমন—অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান নিশ্চিত করার পর উদ্বৃত্ত সব সম্পদ বা আয় দিয়ে সবার আগে ঋণ পরিশোধ করা উচিত। (আল-ফতোয়া আল-হিন্দিয়া, ৫/৩৬৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০০)

সাধারণত আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হয়ে গেলেই মানুষ ঋণের চক্রে আটকা পড়ে। অনেক সময় ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি পাওনাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান অথবা মিথ্যা কথা বলেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত পাওনাদারের সঙ্গে বিনীত আচরণ করা এবং নিজের অক্ষমতার কথা সততার সঙ্গে জানিয়ে তার কাছে অতিরিক্ত সময় চাওয়া।

ঋণ পরিশোধের লক্ষ্যে অলসতা ত্যাগ করে হালাল পথে উপার্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। ইসলামে কর্মবিমুখতার কোনো স্থান নেই। নিজের সাধ্যমতো কঠোর পরিশ্রম করে আয় করতে থাকলে আল্লাহ সেই উপার্জনে বরকত দান করেন। কোনো কাজকেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।

আবারও উল্লেখ্য যে, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি অনেক সময় পাওনাদারের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান বা মিথ্যা কথা বলেন, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উচিত পাওনাদারের সঙ্গে বিনীত আচরণ করা এবং নিজের অক্ষমতার কথা সততার সঙ্গে তুলে ধরে তার কাছে সময় চাওয়া।

পবিত্র কোরআনেও পাওনাদারদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘আর ঋণগ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দেওয়া উচিত।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮০)

পরিশেষে বলা যায়, ঋণ কোনো স্থায়ী অভিশাপ নয়, বরং এটি জীবনের একটি পরীক্ষামাত্র। উপার্জনে কঠোর পরিশ্রম, জীবনযাপনে পরিমিতিবোধ এবং আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়ার মাধ্যমে পাহাড়সম ঋণের বোঝাও একসময় ধীরে ধীরে নেমে যায়। আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখলে তিনি এমন পথ থেকে রিজিকের ব্যবস্থা করেন, যা মানুষের কল্পনারও অতীত।