পবিত্র কোরআনে ঘুমকে মানুষের জন্য প্রশান্তির এক বিশেষ উপহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, “আর আমি তোমাদের ঘুমকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী ও বিশ্রামস্বরূপ।” (সুরা নাবা, আয়াত: ৯)।

ইসলামি জীবনদর্শনে রাতে বিছানায় যাওয়া থেকে শুরু করে সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কিছু সুন্নত ও আদব পালনের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই নিয়মগুলো মেনে চললে ঘুম কেবল শারীরিক বিশ্রামের মাধ্যম থাকে না, বরং তা ইমানি চেতনায় সমৃদ্ধ এক বিশেষ আত্মিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়।

ঘুমের পূর্বে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা এবং শয়নকক্ষের পরিবেশের ওপর ইসলাম বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী রাতে ঘুমানোর আগে বিছানা হালকা করে ঝেড়ে পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩২০)। এছাড়া ডান কাত হয়ে কিবলামুখী হয়ে ঘুমানো নবীজির অন্যতম একটি ঐতিহ্য। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১১)। পাশাপাশি তিনি রাতে ঘুমানোর পূর্বে ঘরের আলো নিভিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২৮০)।

ইসলামে ঘুমকে এক প্রকার ছোট মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হয়। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়ে এবং যার মৃত্যু আসেনি তার প্রাণ হরণ করেন নিদ্রার সময়ে।” (সুরা জুমার, আয়াত: ৪২)। যেহেতু ঘুমের সময় মানুষের আত্মা এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, তাই নিদ্রায় যাওয়ার পূর্বে আত্মিক সুরক্ষার জন্য মহানবী (সা.) সুনির্দিষ্ট কিছু দোয়া ও আয়াত পাঠের শিক্ষা দিয়েছেন।

রাতের ঘুমে ঢলে পড়ার ঠিক মুহূর্তে তিনি এই দোয়াটি পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: ‘বিস্মিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহয়া’
অর্থ: “হে আল্লাহ, তোমার নামে মৃত্যুবরণ করছি (ঘুমাচ্ছি) এবং পুনরায় জীবিত হব (জেগে উঠব)।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২)।

পাশাপাশি ঘুমের পূর্বে আয়াতুল কুরসি পাঠ করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কারণ যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত করা হয় এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে ভিড়তে পারে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩১১)।

সকালে জেগে ওঠার পর হাত-মুখ ধোয়া, পরিচ্ছন্ন হওয়া এবং ফজরের সালাতের মাধ্যমে নিজের দৈনন্দিন যাত্রা শুরু করা একজন মুমিনের শরীর ও মনকে পুরো দিনের কাজের জন্য উদ্যমী করে তোলে। এছাড়া সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করে হাতে ফুঁ দিয়ে পুরো শরীরে হাত বোলানোও নবীজির অন্যতম নিয়মিত আমল ছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০১৭)।

ঘুমের ঘোর থেকে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মহানবী (সা.) মহান আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই দোয়াটি পাঠ করতেন:
উচ্চারণ: ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।’
অর্থ: “সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর পুনরায় জীবন দান করলেন এবং তাঁর দিকেই সবার পুনরুত্থান ঘটবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২)।

পরিশেষে বলা যায়, ঘুমের শারীরিক প্রয়োজনটিকে যখন ইসলামি নীতি ও সুন্নতের আলোকে সাজানো হয়, তখন তা শুধু শারীরিক ক্লান্তিই দূর করে না, বরং মানুষের আত্মাকে শান্তি ও সুরক্ষায় ভরিয়ে তোলে।