ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, দোয়া ইবাদতের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং মুমিনের প্রার্থনা আল্লাহ-তাআলা কবুল করেন। তবে দোয়ার কবুলিয়তের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আদব ও শর্ত রয়েছে। কিছু বিশেষ কাজ বা পরিস্থিতি দোয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। মুহাদ্দিস ফয়জুল্লাহ রিয়াদ দোয়া কবুল না হওয়ার পেছনে প্রধান ছয়টি কারণ উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, হারাম উপার্জন ও খাদ্য দোয়া কবুলের পথে বড় অন্তরায়। মানুষের জীবনযাপনের মাধ্যম এবং খাদ্যের পবিত্রতার সঙ্গে ইবাদতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নবীজি (সা.) এমন এক ব্যক্তির উদাহরণ দিয়েছেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে, শরীর ধুলোমলিন এবং সে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব, হে আমার রব’ বলে দোয়া করছে। কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম এবং হারাম খাদ্য দিয়েই তার শরীর গঠিত। এই অবস্থায় নবীজি (সা.) প্রশ্ন করেছেন, ‘তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)। তাই প্রার্থনার আগে উপার্জনের বৈধতা যাচাই করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, দোয়ায় একনিষ্ঠতার অভাব। বান্দার অন্তর যেন পুরোপুরি আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল থাকে। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘অতএব, তোমরা একনিষ্ঠচিত্তে আল্লাহকে ডাকো।’ (সুরা মুমিন, আয়াত: ১৪)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর জন্যই ধর্মকে একনিষ্ঠ রাখবে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)।
তৃতীয়ত, পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দোয়া করা। দোয়া কেবল কল্যাণের জন্য, অন্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে পাপের কাজ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।’ (বুখারি, আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৬৫৫)।
চতুর্থত, অন্তরে বিনয় ও বিশ্বাসের অভাব। দোয়া কেবল মুখে উচ্চারণের নাম নয়, বরং এটি অন্তরের নিবেদন। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ডাকো বিনীতভাবে ও গোপনে।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৫৫)। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করো এ বিশ্বাস নিয়ে যে তা কবুল হবে। আর জেনে রাখো, আল্লাহ উদাসীন ও অমনোযোগী হৃদয়ের দোয়া কবুল করেন না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৪৭৯)।
পঞ্চমত, প্রার্থনার ফল পেতে তাড়াহুড়া করা। অনেক সময় দীর্ঘ সময় দোয়া করেও ফল দৃশ্যমান হয় না, যা হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে আল্লাহ তাঁর হিকমতে সঠিক সময়ে আবেদন পূরণ করেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারও দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, “আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।”’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৪০)।
ষষ্ঠত, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া। সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় প্রতিরোধ না করলে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে। রাসুল (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে, অন্যথায় অচিরেই আল্লাহ তোমাদের ওপর নিজের পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৯)।
পরিশেষে, দোয়া কবুল না হলে হতাশ না হয়ে নিজের জীবন ও আমলের এই ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করে সংশোধন করাই একজন মুমিনের প্রকৃত করণীয়।