একজন মুমিনের সামগ্রিক জীবনব্যবস্থায় ইবাদত হলো অবিচ্ছেদ্য অংশ। নামাজ, রোজা, দান-সদকা কিংবা আর্তমানবতার সেবা—সবই নেক আমলের আওতায় পড়ে। তবে কেবল আমল করলেই তা যথেষ্ট হয় না; বরং সেই আমলটি আল্লাহ-তায়ালার দরবারে কবুল হওয়া বা গ্রহণযোগ্য হওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যেকোনো আমলের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর কাছ থেকে প্রতিদান লাভের ওপর। ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন, তা নিচে আলোচনা করা হলো।
নেক আমল কবুল হওয়ার প্রথম ও মৌলিক শর্ত হলো ইমান। আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস, তাঁর নির্দেশিত পথে চলা এবং শিরক বা অংশীদারিত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকাই একজন মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি। ইমান ছাড়া কোনো আমলই পরকালে মুক্তি কিংবা প্রতিদান লাভের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হতে পারে না।
এই বিষয়ে আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘আর যে মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, পুরুষ হোক কিংবা নারী, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৪)
উল্লিখিত আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহর কাছে সৎকর্মের প্রতিদান পাওয়ার সাথে ইমানের এক গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই একজন মুমিনের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো বিশুদ্ধ ইমান নিয়ে জীবন অতিবাহিত করা এবং শিরকসহ ইমানের পরিপন্থী যাবতীয় বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা।
দ্বিতীয়ত, কোনো কাজকে ইবাদত হিসেবে গণ্য করতে হলে তা অবশ্যই রাসুলের (সা.) নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ধর্মের নামে এমন কোনো ইবাদত বা পদ্ধতি উদ্ভাবন করা ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়, যার কোনো ভিত্তি নেই। ইবাদত মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম। তাই ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসুলের (সা.) সুন্নাহর অনুসরণ অপরিহার্য।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের এ বিষয়ে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭)
তৃতীয়ত, নেক আমল কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন এবং পবিত্র খাবার গ্রহণের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন ব্যক্তি নামাজ পড়ছেন, রোজা রাখছেন কিংবা দান-সদকা করছেন, কিন্তু তাঁর উপার্জন ও ভোগের উৎস যদি হারাম হয়, তবে তা ইবাদত কবুলের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’
এরপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত ও ধুলামলিন অবস্থায় দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করে। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং হারাম উপার্জন দিয়েই তার জীবন পরিচালিত। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এই হাদিস থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনযাপন ইবাদত কবুলের জন্য অত্যন্ত জরুরি। হারাম উপার্জন মানুষের আত্মিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং ইবাদত কবুলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই নেক আমলের পাশাপাশি উপার্জন ও ভোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল-হারামের বিধান মেনে চলা একান্ত প্রয়োজন।
চতুর্থ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ইখলাস। ইখলাস মানে হলো মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত করা।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তাদের তো এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে তারা আল্লাহর ইবাদত করবে তারই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।’ (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)
যদি কেউ মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য দান করেন, নিজেকে ধার্মিক হিসেবে জাহির করতে ইবাদত করেন কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে নেক কাজ করেন, তবে তা ইখলাসের পরিপন্থী। ইসলামে এই লোকদেখানো মনোভাবকে ‘রিয়া’ বলা হয়, যা কঠোরভাবে নিন্দিত।
আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘অতএব দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোকদেখানোর জন্য তা করে। (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)
সুতরাং, যেকোনো আমল করার আগে নিজের নিয়ত বা উদ্দেশ্য যাচাই করা উচিত। নিজেকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন যে, কাজটি কি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হচ্ছে, নাকি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য? নিয়ত বিশুদ্ধ রাখা এবং লোকদেখানো মনোভাব থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করাই হলো ইখলাসের পথে চলার সঠিক উপায়।
— রায়হান আল ইমরান : আলেম, লেখক ও গবেষক