সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে মানুষ প্রশান্তির খোঁজে নিজের ঘরেই ফিরে আসে। বাহ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা ঘরে তালা বা প্রহরীর ব্যবস্থা করি, তবে অদৃশ্য বিপদ, শয়তানের প্ররোচনা এবং বিভিন্ন বালা-মুসিবত থেকে ঘরকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ইসলামে কিছু সুনির্দিষ্ট আমলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মুমিনের ঘরকে দুনিয়াবি ও আধ্যাত্মিক—উভয় দিক থেকেই নিরাপদ ও বরকতময় করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো পাঁচটি বিশেষ আমল নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, ঘরকে জিন ও শয়তানের উপদ্রব থেকে মুক্ত রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো পবিত্র কোরআন পাঠ, বিশেষ করে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যে ঘরে কোরআন পড়া হয় না, সেই ঘরকে কবরস্থানের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের ঘরগুলোকে কবরস্থান বানিয়ো না; নিশ্চয়ই শয়তান ওই ঘর থেকে পলায়ন করে, যে ঘরে সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৮০)। তাই প্রতিদিন সম্ভব না হলেও মাঝেমধ্যে ঘরে সুরা বাকারা পড়ার অভ্যাস করা অত্যন্ত উত্তম।
দ্বিতীয়ত, ঘরের ভেতরে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার একটি অন্যতম আমল হলো ঘরে প্রবেশের সময় সালাম দেওয়া। পরিবারের সদস্যদের সামনে প্রবেশ করলেও তাঁদের উদ্দেশ্য করে সালাম দেওয়া কোরআনের নির্দেশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যখন কোনো ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা একে অপরকে সালাম করবে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এক কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৬১)। সালামের মাধ্যমে ঘরে বরকত প্রবেশ করে। সাহাবি আনাস (রা.)-কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘হে বৎস, তুমি যখন তোমার পরিবারের কাছে প্রবেশ করবে, তখন সালাম দেবে; এতে তোমার এবং তোমার পরিবারের জন্য বরকত হবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৯৮)।
তৃতীয়ত, সন্ধ্যার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে আল্লাহর নাম নিয়ে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এই আমলের মাধ্যমে ঘর অদৃশ্য ক্ষতিকর প্রাণী ও শয়তানের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত থাকে। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে দরজা বন্ধ করো; কারণ শয়তান বন্ধ দরজা খুলতে পারে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২২০)। একইভাবে ঘরের পানিপাত্র বা খাবারের থালাও ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ঢেকে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থত, যে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না, সেই ঘর মূলত আধ্যাত্মিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। ঘরে শখ করে কোনো প্রাণীর ছবি (যেখানে অবয়ব স্পষ্ট) বা ভাস্কর্য সাজিয়ে রাখা হলে সেখানে রহমতের ফেরেশতা আসেন না। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ঘরে কুকুর বা প্রাণী ও মানুষের ছবি থাকে, সে ঘরে (রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২২৫)। হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য ফতোয়াগ্রন্থেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঘরে এমন কোনো ছবি বা মূর্তি ঝুলিয়ে রাখা বা সাজিয়ে রাখা মাকরুহ তাহরিমি, যা দেখলে প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ আকৃতি বোঝা যায়; কারণ এটি রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ। (ইবনে আবিদিন, রদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ১/৬৪৭, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)।
পঞ্চমত, পবিত্র কোরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি। রাতে ঘুমানোর আগে এই আয়াত পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘরের জন্য একজন পাহারাদার বা ফেরেশতা নিযুক্ত করা হয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি আবু হোরাইরা (রা.)-কে শিখিয়ে দেয় যে ‘যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন আয়াতুল কুরসি পড়বে; তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর হওয়া পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছেও ঘেঁষতে পারবে না।’ আবু হোরাইরা (রা.) যখন নবীজির কাছে এই ঘটনা জানালেন, তখন তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘সে নিজে চরম মিথ্যুক হলেও তোমাকে সম্পূর্ণ সত্য কথাই বলেছে। হে আবু হোরাইরা, তুমি কি জানো গত তিন রাত তুমি কার সঙ্গে কথা বলেছ? সে ছিল শয়তান।’ (সহিহি বুখারি, হাদিস: ৩২১১)।
পরিশেষে বলা যায়, বাহ্যিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে এই আমলগুলোর নিয়মিত চর্চা মুমিনের ঘরকে দুনিয়াবি ও আধ্যাত্মিক—উভয় দিক থেকেই সুরক্ষিত, নিরাপদ ও প্রশান্তিময় করে তোলে।