রাত গভীর। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আপনি। শরীরে ক্লান্তি, মনে নানা চিন্তা—কাজের চাপ, সংসারের ভাবনা বা ভবিষ্যতের উদ্বেগ। এমন সময়ে বিছানায় যাওয়ার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন, অজু করেছেন তো?

অজু সাধারণত নামাজ বা কোরআন স্পর্শের জন্য করা হয় বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও এর গুরুত্ব কম নয়। যখন একজন মুমিন দৈনন্দিন কাজটি সুন্নাহর আলোকে সম্পন্ন করেন, তখন তা কেবল ঘুম থাকে না; তা ইবাদতে পরিণত হয়।

অজু শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতার নাম নয়, এটি আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তিরও মাধ্যম। দিনের ক্লান্তি যখন মনকে ভারী করে দেয়, তখন অজুর শীতল পানি মুখ, হাত ও শরীরে লাগলে এক ধরনের স্বস্তি পাওয়া যায়। মনে হয়, ক্লান্তির ওপর প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেওয়া হলো। অস্থির মনে ঘুম আসে না; চোখ বন্ধ করলেও মন ছুটে বেড়ায় অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তায়। অজু সেই মানসিক কোলাহল কমিয়ে শান্তির প্রস্তুতি নেয়।

এই আমলের পেছনে রয়েছে রাসুল (সা.)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশনা। সাহাবি বারা ইবনে আজিবকে রাসুল (সা.) বলেছেন, যখন তুমি বিছানায় যাবে, তখন নামাজের অজুর মতো অজু করে নেবে। এরপর তিনি ঘুমানোর আরও কিছু আদব শিক্ষা দিয়েছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৭)

এই সুন্নাহর সাথে জড়িত আরও একটি গভীর বিষয় হলো মৃত্যুর প্রস্তুতি। হাদিসে এসেছে, অজু করে বিছানায় গিয়ে ঘুমানোর পর যদি কারও মৃত্যু হয়, তবে সে ফিতরাতের ওপর মৃত্যুবরণ করবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭২৫)

'ফিতরাত' শব্দটি এখানে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অন্য একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক শিশু ফিতরাতের ওপর জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক করে তোলে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৮৫)

মুহাদ্দিসরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, ফিতরাত দ্বারা মানুষের স্বাভাবিক তাওহিদি বিশ্বাস ও ইসলামের সহজাত প্রবণতাকে বোঝানো হয়েছে। যদি সেই ঘুমই জীবনের শেষ ঘুম হয়ে যায়, তবু অন্তত একজন মুমিন তার রবের কাছে যাওয়ার আগে সুন্নত অনুসরণের চেষ্টা করে গেছেন।

ঘুম ও মৃত্যুর মধ্যে একটি অদ্ভুত সাদৃশ্য আছে। দুটিতেই মানুষ নিজের ইচ্ছাশক্তি হারিয়ে বাইরের জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাই মুমিনের উচিত এমন অবস্থায় ঘুমাতে যাওয়া, যে অবস্থায় তিনি আল্লাহর সামনে ফিরে গেলেও প্রস্তুত থাকেন। অজু করতে কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না, কিন্তু এর মাধ্যমে শরীর পরিচ্ছন্ন, মন প্রশান্ত এবং সুন্নাহ জীবনে ধারণ করা সম্ভব। কে জানে, কোন রাতটি আমাদের শেষ রাত?