আমি স্বভাবগতভাবেই খুব নরম মনের মানুষ। কারও প্রতি দীর্ঘকাল ধরে রাগ পুষে রাখা আমার স্বভাবে নেই। তবে জীবন চলার পথে এমন কিছু মানুষের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়, যাদের দেওয়া আঘাতগুলো চাইলেও ভোলা সম্ভব হয় না। আমার জীবনেও তেমন কিছু মানুষ রয়ে গেছেন, যাদের কথা মনে পড়লে আজও মন খারাপ হয়।

স্মৃতিগুলো ফিরে তাকালে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। তখন আমি তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। একদিন টিফিন পিরিয়ডে ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটি বের করতে গিয়ে দেখি, বক্সটিই সেখানে নেই। অথচ সেদিন খুব শখ করে স্যান্ডউইচ তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। নইলে প্রতিদিনের সেই একঘেয়ে ডিমভাজি আর রুটির পালা চলত।

সবার যখন টিফিন খাওয়ার ধুম, আমি তখন পুরো ক্লাসরুমে চিরুনি তল্লাশির মতো করে আমার টিফিন বক্স খুঁজছি। কিন্তু কোথাও তার হদিস পাওয়া গেল না। পরে জানতে পারলাম, আমারই বন্ধু মাইশা প্রথম পিরিয়ডেই আমার ব্যাগ থেকে টিফিন বক্সটি সরিয়ে নিয়ে নিজের উদরপূর্তি করে নিয়েছে। বন্ধুত্বের এমন নমুনা দেখার পর মনে হলো, আলাদা করে আর শত্রুর প্রয়োজন কী!

সেই সময়ে সাকিব নামের আরও একটি ছেলে ছিল। সে আমার সাথে যা করেছিল, তা মনে করলে আজও কান্না পায়। তখন আমার চুল ছিল বেশ ঘন এবং লম্বা। চুলে নানা রকম সাজসজ্জা করে একদিন টিউশনে গিয়েছিলাম। স্যার যখন ক্লাস নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে সেই বদমাশ ছেলেটি আমার চুলে চুইংগাম লাগিয়ে দিল। চুইংগামটি এমনভাবে লেগেছিল যে আমার সেই শখের লম্বা ও ঘন চুল আর বাঁচানো সম্ভব হলো না। বাসায় ফেরার পর বাবা আমাকে নাপিতের কাছে নিয়ে গেলেন এবং সব চুল কেটে দিতে বললেন।

আসলে জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যেগুলোকে আমরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি। এই মানুষগুলোও একসময় আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে বটে। কেউ বলেছে, ‘ইচ্ছা করে করিনি।’ কেউ বলেছে, ‘তখন বুঝিনি।’ কেউ আবার সরাসরি বলেছে, ‘স্যরি!’

এরপর টাক মাথা নিয়ে সহপাঠীদের হাসাহাসির যে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, তা আর বলে শেষ করা যাবে না। একটি সামান্য চুইংগামের জন্য যে আমাকে এত বড় মূল্য দিতে হবে, তা তখন বুঝিনি। একটি বদমাশ বন্ধুর কারণে সারা জীবনের কান্না হয়ে রইল।

বয়স যখন একটু বাড়ল, স্কুলে আমার চেয়ে তিন বছরের বড় এক সিনিয়র ভাইয়া ছিলেন। তাকে আমার খুব ভালো লাগত। একবার তিনি আমাকে চকলেট এবং গোলাপ ফুল উপহার দিয়েছিলেন। সেই উপহারের প্যাকেটটি আমি অত্যন্ত যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী লাভ হলো!

কিছুদিন পর দেখলাম, আমারই সবচেয়ে কাছের বন্ধু তিশা আর সেই ভাইয়া প্রেম করছেন। তাদের একসঙ্গে দেখলে আমার বুকটা হুঁ হুঁ করে উঠত। বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসা—এই দুই জায়গায় একসাথে এমন ডাবল ধাক্কা খাওয়ার পর মানুষ আর কাকে বিশ্বাস করবে!

পরবর্তীতে বড় হয়ে একটি চাকরিতে যোগ দিলাম। সবকিছুই বেশ ভালো চলছিল। কিন্তু সেখানে দেখা হলো এক তেলবাজ মানুষের সঙ্গে। সে বসকে এমনভাবে তোষামোদ করল যে, আমার বদলে প্রমোশনটি পেয়ে গেল সেই তেলবাজ মোখলেস।

আমি ভেবেছিলাম, প্রমোশন পেলে একটি স্কুটি কিনব। কিন্তু স্কুটি তো দূরের কথা, আমি যে মোখলেসকে অপছন্দ করি, তা বুঝতে পেরে সে বসের কাছে আমার নামে এমন দুর্নাম করল যে শেষ পর্যন্ত আমাকে চাকরিটাই হারাতে হলো।

আসলে জীবনে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে, যেগুলো আমরা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি। এই মানুষগুলোও একসময় আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে বটে। কেউ বলেছে, ‘ইচ্ছা করে করিনি।’ কেউ বলেছে, ‘তখন বুঝিনি।’ কেউ আবার সরাসরি বলেছে, ‘স্যরি!’

কিন্তু আপনারাই বলেন, স্যরি বললেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?

যে আমার টিফিন খেয়ে ফেলেছিল, সে কি আমার স্যান্ডউইচটি ফিরিয়ে দিতে পেরেছে? যে আমার চুল কেটে ফেলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সে কি আমার সেই চুল ফিরিয়ে দিতে পারবে? যে আমার প্রেম কেড়ে নিয়েছে, সে কি সেই গোলাপ আর চকলেটের দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবে? আর মোখলেসের কথা তো আর বলার অবকাশ নেই!

তবে আবারও বলছি, আমি মানুষটা নরম প্রকৃতির। দুই দিনের জীবনে তিন দিন কি আর রাগ পুষে রাখা যায়? তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একদিন ওদের সবাইকে ক্ষমা করে দেব। ওরা সবাই থাকুক সুখে, আগুন জ্বলুক আমার বুকে।