মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থির ও সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রভাব এবার পড়ল এশিয়ার সবচেয়ে বড় জাতীয় দলভিত্তিক ফুটবল আসরে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণে ২০২৭ সালের এএফসি এশিয়ান কাপ প্রায় এক বছর পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবে আগামী জানুয়ারিতে এই টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা থাকলেও, নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে শুরু হবে এই প্রতিযোগিতা। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক হামলা এবং এর ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি, যাতায়াত ব্যবস্থা ও আয়োজনসংক্রান্ত নানাবিধ জটিলতার কথা বিবেচনা করে এই পদক্ষেপ নিয়েছে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)।

গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সূচি পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছে এএফসি। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে ৫ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়ার কথা ছিল এশিয়ান কাপের ১৯তম আসর। তবে নতুন সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ২০২৮ সালের ২১ জানুয়ারি শেষ হবে এই ফুটবল লড়াই। অর্থাৎ, এশিয়ার ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের এই লড়াইটি প্রায় সাড়ে ১১ মাস পিছিয়ে দেওয়া হলো।

এএফসি জানিয়েছে, সৌদি আরবের স্থানীয় আয়োজক কমিটি এবং দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা ও পারস্পরিক পরামর্শের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে আগের সূচি অনুযায়ী টুর্নামেন্ট আয়োজন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা উদ্বেগ, যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং আয়োজনের বিভিন্ন জটিলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংস্থটি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, “মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তৈরি হওয়া ব্যতিক্রমী অবস্থা এবং উল্লেখযোগ্য লজিস্টিক জটিলতা ও ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতার কারণে এশিয়ান কাপের সূচি পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে আয়োজক কমিটি।”

এএফসির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলে অংশগ্রহণকারী দল, কর্মকর্তা, দর্শকসহ সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সব দিক বিবেচনা করেই টুর্নামেন্ট পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে নতুন সূচিটি কার্যকর করার জন্য বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার অনুমোদন প্রয়োজন। এএফসি জানিয়েছে, সংশোধিত সূচিটি অনুমোদনের জন্য ফিফার কাছে পাঠানো হবে। ফলে প্রতিযোগিতা পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নতুন তারিখগুলো এখনো ফিফার আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

উল্লেখ্য, সৌদি আরবে সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। গত অক্টোবর থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা এসব হামলার কয়েকটির দায় স্বীকার করেছে। বিশেষ করে গত অক্টোবরে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার দায় স্বীকার করে হুতি বিদ্রোহীরা। সর্বশেষ গত সোমবার দাম্মাম বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ড্রোন পাঠানোর দাবিও জানিয়েছে এই গোষ্ঠীটি। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

এশিয়ান কাপের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই অনিশ্চয়তা চলছিল। গত ১৪ অক্টোবর এএফসি সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে প্রতিযোগিতাটি এক বছর পিছিয়ে ২০২৮ সালে নেওয়া হতে পারে। তবে তখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাড়া নেই বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

পরদিন ১৫ অক্টোবর সৌদি আরবের স্থানীয় আয়োজক কমিটি জানিয়েছিল, এশিয়ান কাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নির্ধারিত সূচি অনুযায়ীই এগিয়ে চলছে। ভেন্যু, অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে এএফসির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়। এমনকি গত ২৬ অক্টোবর প্রতিযোগিতার ম্যাচের সময় ও ভেন্যু চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিক সূচিও প্রকাশ করেছিল এএফসি। সেই সূচি অনুযায়ী ৭ জানুয়ারি রিয়াদের কিং ফাহদ স্পোর্টস সিটি স্টেডিয়ামে স্বাগতিক সৌদি আরব ও ফিলিস্তিনের ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সূচি প্রকাশের মাত্র আট দিনের মাথায় পুরো প্রতিযোগিতাই পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।

সৌদি আরবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে এরই মধ্যে একাধিক আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গলফের সৌদি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিযোগিতা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে আরবান সাইক্লিং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। এছাড়া রিয়াদে অনুষ্ঠেয় সিক্স কিংস স্ল্যাম টেনিস প্রতিযোগিতাও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই কারণে জেদ্দায় অনুষ্ঠেয় ফিফা ই-স্পোর্টসের ফিফাই ফাইনালস ২০২৬-ও স্থগিত করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিরাপত্তা শঙ্কায় দেশটির ঘরোয়া ফুটবল ও আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতার সূচিতেও বিঘ্ন ঘটেছে।

এশিয়ান কাপের আগামী আসর সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো এশিয়ার সর্বোচ্চ জাতীয় দলভিত্তিক ফুটবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে যাচ্ছে দেশটি। রিয়াদ, জেদ্দা ও আল খোবারের আটটি স্টেডিয়ামে ২৪টি দলের অংশগ্রহণে মোট ৫১টি ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। আয়োজক দেশ হিসেবে এটি ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের প্রস্তুতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এদিকে প্রতিযোগিতার মূল পর্বে জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। বাছাইপর্বে সিঙ্গাপুর, হংকং ও ভারতের সঙ্গে 'সি' গ্রুপে খেলেছিল হামজা চৌধুরীদের দল। ছয় ম্যাচে একটি জয়, দুটি ড্র ও তিন হারে ৫ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে থেকে অভিযান শেষ করে বাংলাদেশ। এই গ্রুপ থেকে অপরাজিত থেকে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে সিঙ্গাপুর।