সৌদি আরবের কোনো তেল স্থাপনায় আগুন লাগলে তার উত্তাপ শুধু আরব উপদ্বীপে আটকে থাকে না। বাংলাদেশের একটি গ্রামের সংসারেও তা পৌঁছাতে পারে, জ্বালানির বাড়তি দাম হয়ে, সৌদিপ্রবাসী সন্তানের বেতন বন্ধ হওয়ার সংবাদ হয়ে, কিংবা ঋণ করে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আসলে এই দূরের ঘটনাগুলোর সঙ্গে আমাদের জীবনের সংযোগ বোঝার বিদ্যা। আর নিরাপত্তার প্রশ্ন হলো, সেই সংযোগের মধ্যে রাষ্ট্র ও মানুষ কতটা সুরক্ষিত।

২০২৬ সালের অক্টোবরের হুতি-সৌদি সংঘাত এই সম্পর্ককে আবার সামনে এনেছে। বিষয়টি আর সীমান্তের দুই পাশের লড়াই নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতা, বিশ্ববাণিজ্য ও মানুষের জীবিকা।

প্রথমে একটি পার্থক্য পরিষ্কার করা দরকার। সৌদি আরব একটি রাষ্ট্র, হুতিরা ইয়েমেনের একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন, যাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। তাদের সঙ্গে গোটা ইয়েমেনের মানুষকে এক করে দেখা ভুল। একইভাবে মুসলিম বিশ্বও একক রাজনৈতিক সত্তা নয়। একই ধর্মের অনুসারী হলেই রাষ্ট্রের স্বার্থ, শাসকের নিরাপত্তাবোধ কিংবা জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা এক হয়ে যায় না।

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের প্রধান ভাষা আরবি, উভয় সমাজেই ইসলাম গভীরভাবে প্রোথিত। তবু ভাষা যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করলেও স্বার্থের বিরোধ মুছে দেয় না। ধর্ম নৈতিক সংহতির ভিত্তি হতে পারে, কিন্তু সীমান্ত, সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের স্বয়ংক্রিয় সমাধান দেয় না। ইরান আবার মুসলিমপ্রধান হলেও আরব দেশ নয়। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিরোধকে একই ভাষাভাষী মানুষের ঝগড়া বললেও পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না।

শিয়া-সুন্নি বিভাজন এখানে প্রাসঙ্গিক হলেও সেটিই সবকিছুর ব্যাখ্যা নয়। হুতিদের স্থানীয় ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, ইয়েমেনের বঞ্চনার ইতিহাস, সৌদি সীমান্তনিরাপত্তা এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব—সবই বিবেচনায় নিতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব শুধু কূটনৈতিক অংশীদার নয়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। বিএমইটির কর্মকর্তার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজের জন্য সৌদি আরবে গেছেন। এক বছরে একটি দেশে এত বিপুল কর্মী পাঠানো সুযোগের পাশাপাশি নির্ভরতার গভীরতাও বোঝায়।

বর্তমান সংঘাতের পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের ব্যর্থ রাজনৈতিক রূপান্তর ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের ভাঙন। ২০১৫ সালের মার্চে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের সমর্থনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি সহিংসতা কমায়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে দেশব্যাপী যুদ্ধবিরতি, সরকারি বেতন, তেল রপ্তানি ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে অঙ্গীকারও আসে। কিন্তু অঙ্গীকারকে কার্যকর শান্তিব্যবস্থায় পরিণত করার কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।

যুদ্ধ থামা এবং যুদ্ধের কারণ দূর হওয়া এক বিষয় নয়। অস্ত্র কিছুদিন নীরব থাকতে পারে, অথচ ক্ষমতা বণ্টন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক অধিকার অমীমাংসিত থাকতে পারে। নতুন আঞ্চলিক উত্তেজনা তখন পুরোনো যুদ্ধকে আবার জ্বালিয়ে দেয়।

২০২৩ সালে চীনের সহায়তায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়েছিল। এটি দেখিয়েছিল, প্রতিদ্বন্দ্বীরাও প্রয়োজন হলে সমঝোতা করতে পারে। কিন্তু দুই রাজধানীর সম্পর্ক উন্নত হলেই স্থানীয় সশস্ত্র পক্ষের হিসাব বদলায় না। আঞ্চলিক সমঝোতার পাশাপাশি ইয়েমেনের নিজস্ব রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন।

সৌদি আরবের নিরাপত্তাচিন্তা বোঝা কঠিন নয়। প্রতিবেশী ভূখণ্ড থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি কোনো রাষ্ট্রই সহজভাবে নেবে না। কিন্তু সামরিক প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনে বেসামরিক ক্ষতি বাড়লে নতুন ক্ষোভ ও প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে হুতিরা নিজেদের প্রতিরোধকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেও বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক জাহাজ কিংবা বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা সাধারণ মানুষের বিপদ বাড়ায়। নিরাপত্তার দাবি কোনো পক্ষকেই সীমাহীন বলপ্রয়োগের অধিকার দেয় না।

এটি নিরাপত্তা-দ্বন্দ্বের পরিচিত রূপ: এক পক্ষ নিজের সুরক্ষায় যে ব্যবস্থা নেয়, অন্য পক্ষ সেটিকে আক্রমণের প্রস্তুতি ভাবে। ফলে প্রত্যেকে নিরাপত্তা খুঁজতে গিয়ে সবার অনিরাপত্তা বাড়ায়।

এই যুদ্ধে সম্পদ ও সামরিক ব্যয়ের হিসাবও সরল নয়। সৌদি আরবকে বিস্তৃত তেল অবকাঠামো, বিমানবন্দর, বন্দর ও নগরজীবন রক্ষা করতে হয়। কয়েকটি হামলাই বড় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। অস্ত্র কেনার সামর্থ্য এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিরাপদ রাখার সামর্থ্য এক নয়।

সৌদি আরবের আর্থিক সম্পদ, উৎপাদনক্ষমতা ও অবকাঠামো মেরামতের সামর্থ্য রয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর আরামকোর দ্রুত কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের প্রতিবেদনও সেই সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়। তবে সহনশীলতা থাকা মানে দীর্ঘ যুদ্ধের ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকা নয়।

বিপদটি দ্বিমুখী। তেল স্থাপনা ও পরিবহনপথ আক্রান্ত হলে বর্তমান আয়ের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে পর্যটন, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থা দুর্বল হলে ভবিষ্যতের বিকল্প অর্থনীতিও বাধাগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ যুদ্ধ তেলনির্ভরতা কমানোর পথকেই ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।

ক্ষতিটা শুধু ধ্বংস হওয়া ভবনের দামে মাপা যাবে না। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের অর্থ প্রতিরক্ষা ও পুনর্নির্মাণে সরানোর চাপও বাড়ে। নিরাপত্তাহীনতা এভাবেই ভবিষ্যতের সুযোগ খেয়ে ফেলে।

তবে ইয়েমেনের মানুষের বিপর্যয়কে সৌদি অর্থনীতির আলোচনার আড়ালে রাখা যাবে না। বিশ্বব্যাংকের মে ২০২৬ মূল্যায়নে দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকার কথা বলা হয়েছে। সেখানে যুদ্ধের অর্থ বহু পরিবারের জন্য বিনিয়োগ হারানো নয়, পরের দিনের খাবার হারানো।

মুসলিম বিশ্বের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু সম্পদের অপচয় নয়। বারবার সংঘাত আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করে এবং বাইরের শক্তির ওপর নিরাপত্তা-নির্ভরতা বাড়াতে পারে। পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়লে অস্ত্র কেনা সহজ রাজনৈতিক উত্তর হয়ে ওঠে; সমঝোতার প্রতিষ্ঠান গড়া পিছিয়ে যায়। ফিলিস্তিনসহ অন্য মানবিক সংকটে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার শক্তিও ক্ষয় হয়।

কিছু অস্ত্র ব্যবসায়ী কিংবা বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারী লাভ করতে পারে; কিন্তু আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, পরিবহনব্যবস্থা ও সাধারণ ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। লোহিত সাগরে অনিশ্চয়তা জাহাজকে দীর্ঘ পথ নিতে বাধ্য করলে পরিবহন ও বিমার ব্যয় বাড়ে। সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়। যুদ্ধের মানচিত্র ছোট হলেও তার অর্থনৈতিক পরিধি বিশাল।

বাংলাদেশের জন্য সৌদি আরব শুধু কূটনৈতিক অংশীদার নয়, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। বিএমইটির কর্মকর্তার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সাড়ে সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজের জন্য সৌদি আরবে গেছেন। এক বছরে একটি দেশে এত বিপুল কর্মী পাঠানো সুযোগের পাশাপাশি নির্ভরতার গভীরতাও বোঝায়।

সংঘাত দীর্ঘ হলে নতুন নিয়োগ কমতে পারে, নির্মাণ প্রকল্প ধীর হতে পারে, বেতন ও অতিরিক্ত কাজের আয় অনিশ্চিত হতে পারে। বিশেষত ঋণ করে যাওয়া কর্মীর জন্য কয়েক মাসের আয়হীনতাই বড় বিপর্যয়। গৃহকর্মী ও বিচ্ছিন্ন কর্মস্থলে থাকা শ্রমিকদের কাছে নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য ও সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হতে পারে।

তবে সব খাত সমানভাবে সংকুচিত হবে না। মেরামত, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন কিংবা জরুরি সরবরাহে শ্রমের চাহিদা থাকতে পারে। তাই বাংলাদেশের প্রস্তুতি আতঙ্কভিত্তিক নয়, খাত ও অঞ্চলভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। দূতাবাসের হালনাগাদ কর্মী-যোগাযোগ, বকেয়া মজুরি আদায়ের ব্যবস্থা, প্রয়োজনে প্রত্যাবাসন এবং ফিরে আসা কর্মীর পুনর্বাসন একসঙ্গে ভাবতে হবে। পাশাপাশি বিকল্প শ্রমবাজার ও দক্ষতা উন্নয়নে বাস্তব বিনিয়োগ প্রয়োজন। একটি দেশের ওপর অতিনির্ভরতা কোনো পরিবারের জন্যও নিরাপদ নয়, রাষ্ট্রের জন্যও নয়।

আগামী দিনে সীমিত সংঘাত, বৃহত্তর যুদ্ধ অথবা আলোচনাভিত্তিক সমঝোতা—তিন পথই সম্ভব। টেকসই শান্তির জন্য সীমান্তের নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের সুরক্ষা, ইয়েমেনিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও জীবিকার প্রশ্ন একসঙ্গে সমাধান করতে হবে।

ড. এ কে এম আহসান উল্লাহ অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা এবং অভিবাসন; ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই। ই–মেইল: [email protected]