ফুটবল ধারাভাষ্যের নিজস্ব কিছু ব্যাকরণ থাকে। এমন কিছু নাম থাকে, যা এককভাবে উচ্চারণ করলে যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নামের আগে বা পরে আরেকটি শব্দ যুক্ত না করলে ধারাভাষ্যকারদের তৃপ্তি মেলে না।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এই ধরনের নামের উদাহরণ প্রচুর। সলি মার্চ, রিস জেমস, দেলে আলি, পেদ্রো পোরো কিংবা হার্ভি বার্নস—এসব নাম ধারাভাষ্যকারদের মুখে সবসময় একসাথেই উচ্চারিত হয়। শুধু মার্চ নয়, বরং সলি মার্চ; শুধু জেমস নয়, বরং রিস জেমস। মনে হয় যেন এগুলো কেবল নাম ও পদবি নয়, বরং দুটি নামের এক অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধন।
এই বিশেষ তালিকায় নতুন সদস্য হিসেবে যুক্ত হতে পারেন আরও একজন—লামিনে ইয়ামাল। আর কেন তিনি এই তালিকায় স্থান পাবেন, তার পেছনে রয়েছে এক চমৎকার গল্প।
বার্সেলোনার এই বিস্ময়কর কিশোর সাধারণ ফুটবলারদের মতো নন। খুব অল্প বয়সেই তিনি দুবার ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে সেরা তিনজনের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। এছাড়া জিতেছেন একাধিক লা লিগা শিরোপা এবং স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের গৌরব অর্জন করেছেন। ফুটবলের এই ‘বিস্ময়বালক’কে নিজেদের নামের ক্লাবে নিতে চাইলে রিস জেমস বা দেলে আলিরা নিশ্চয়ই দ্বিমত করবেন না।
তবে এখানে একটি ছোট সমস্যা রয়ে গেছে। ধারাভাষ্যকারেরা এখনো তাঁর নামের উচ্চারণে পুরোপুরি অভ্যস্ত হতে পারেননি। তাঁরা কখনো শুধু ‘ইয়ামাল’ আবার কখনো শুধু ‘লামিনে’ বলে কথা চালিয়ে যান। মাঠের ডান প্রান্ত দিয়ে যখন তিনি বল নিয়ে চোখধাঁধানো দৌড় শুরু করেন, তখন নামের বাকি অংশটুকু যেন হারিয়ে যায়। বলের প্রচণ্ড গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ধারাভাষ্যকারদের জিভ অনেক সময় তাল মেলাতে পারে না।
তবে ইয়ামালের নামের প্রকৃত রহস্য জানলে ধারাভাষ্যকারদের এই দ্বিধা আর দীর্ঘস্থায়ী হবে না। দীর্ঘ সময় ধরে অনেকেরই ধারণা ছিল যে, লামিনে ইয়ামালই এই বার্সেলোনা তারকার সম্পূর্ণ নাম। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তাঁর বাবা মুনির নাসরাউই সম্প্রতি বিষয়টি পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, ইয়ামাল তাঁর ছেলের পদবি নয়। টেরেনো ভাইরালের সঙ্গে এক লাইভ স্ট্রিমে কথা বলার সময় মুনির বলেন, “আমি তোমাদের একটা কথা বলতে চাই। চাই সবাই এটা জানুক: “লামিনে ইয়ামাল” ওর প্রথম নাম।
‘ইয়ামাল’ কোনো পদবি নয়। বন্ধুরা, তাঁর পদবি হলো নাসরাউই এবানা। তাই বিষয়টা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ো না। এ কারণেই আমি সব সময় তাকে “লামিনে ইয়ামাল” বলে ডাকি।”
গত গ্রীষ্মে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের সময় বিবিসি-ও উল্লেখ করেছিল যে, ইয়ামালের নামের সঙ্গে তাঁর মা শেইলা এবানা এবং বাবা মুনির নাসরাউইয়ের পদবি যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর পূর্ণ নাম হলো লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। নামটির দৈর্ঘ্য এত বেশি যে, ধারাভাষ্যকারদের আগেভাগেই দীর্ঘ দম নিতে হতে পারে। ইয়ামাল বল নিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে পৌঁছানোর আগেই পুরো নামটি উচ্চারণ করা শেষ হবে কি না, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, লামিনে এবং ইয়ামাল নাম দুটি এল কোথা থেকে? এখানেই লুকিয়ে আছে আরও একটি সুন্দর কাহিনী। ইয়ামালের জন্মের আগে তাঁর বাবা-মা তাঁদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে একটি কথা দিয়েছিলেন। সেই দুই বন্ধুর একজনের নাম ছিল লামিনে এবং অন্যজনের নাম ছিল ইয়ামাল। আরবি ভাষায় ‘লামিনে’ শব্দের অর্থ হলো ‘বিশ্বস্ত’ এবং ‘ইয়ামাল’ শব্দের অর্থ হলো ‘সৌন্দর্য’। অর্থাৎ বিশ্বস্ততা এবং সৌন্দর্যের এক সংমিশ্রণ।
সেই সময়ে শেইলা এবানা ও মুনির নাসরাউই চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই কঠিন সময়ে এই দুই বন্ধু তাঁদের নিঃস্বার্থভাবে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবেই দম্পতিটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাঁদের সন্তান পুত্র হলে তার নাম রাখা হবে এই দুই বন্ধুর নামে।
সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে জন্ম নিলেন লামিনে ইয়ামাল নাসরাউই এবানা। বর্তমানে যে কিশোরের পায়ের জাদুতে ফুটবল মাঠের সৌন্দর্য নতুন সংজ্ঞা পায়, তাঁর নামের ভেতরেই মিশে আছে বন্ধুত্বের এক অনন্য সৌন্দর্যের গল্প।