ঢাকা থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড়োজাহাজের ভাড়া তুলনামূলক বেশি কেন, তা জানতে চেয়েছে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি। একই সঙ্গে ভাড়া নির্ধারণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে এই কমিটি।

আজ সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেড এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালন কার্যক্রম ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বৈঠকে কমিটির সদস্যরা একটি তুলনামূলক উদাহরণ টেনে বলেন, কুয়ালালামপুর থেকে ম্যানিলার দূরত্ব যতটুকু, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের দূরত্বও প্রায় কাছাকাছি। তবে উড়োজাহাজের ভাড়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঢাকা–কুয়ালালামপুরের টিকিটের দাম কুয়ালালামপুর–ম্যানিলার টিকিটের দামের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। এই বিশাল তারতম্যের কারণ কী এবং ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয় কি না, তা জানতে চায় কমিটি।

এর জবাবে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক গন্তব্যে উড়োজাহাজের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেবিচকের কোনো নীতিমালা নেই; বরং এয়ারলাইন কোম্পানিগুলো নিজেরাই ভাড়া নির্ধারণ করে থাকে। এই তথ্যের পর কমিটির পক্ষ থেকে ভাড়া নির্ধারণের জন্য একটি নীতিমালা তৈরি করা যায় কি না, তা দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সূত্রমতে, বৈঠকে বিমানের নিরীক্ষা আপত্তি নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা চলে। কমিটির পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ১৮টি আপত্তির বিপরীতে প্রমাণসহ সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রদান করা সম্ভব হবে কি না। এছাড়া ত্রুটিযুক্ত উড়োজাহাজ, অচল যন্ত্রপাতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং পুরোনো উড়োজাহাজ কেনার ক্ষেত্রে যারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি ঢাকা–গুয়াংজু–ঢাকা রুটে চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা এবং রাজস্ব আদায়ে ৭৩৬ কোটি টাকার অনিয়ম কীভাবে সংঘটিত হলো, সেই বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।

বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে উত্থাপিত নিরীক্ষা আপত্তির বিপরীতে মোট কত টাকা আদায় করা হয়েছে, কত টাকা অনাদায়ি রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কতজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রতিটি নিরীক্ষা আপত্তির বিপরীতে প্রমাণসহ সময়সীমাবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। উত্থাপিত বিষয়গুলোর বিস্তারিত লিখিত ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় তথ্য পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী উড়োজাহাজ বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হওয়ার কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়সংক্রান্ত অনিয়মের দায় নির্ধারণ এবং আইটি সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর ভ্রমণের ক্ষেত্রে সব সময় বহরের সবচেয়ে আধুনিক উড়োজাহাজ দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় ভ্রমণের আগের এক মাসের ফ্লাইট পর্যবেক্ষণ করা হয় যাতে কোনো ত্রুটি না থাকে। তবে এবারের কারিগরি ত্রুটির কারণ অনুসন্ধানে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানানো হয়।

সূত্র আরও জানায়, ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের লিফট, সেবা ও পরিবেশ নিয়ে কমিটির সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একজন সদস্য বৈঠকে উল্লেখ করেন, অনলাইনে দেখা যায় যে বাংলাদেশ বিমানের টিকিট নেই; কিন্তু বিমানে ওঠার পর দেখা যায়, অনেক সিট ফাঁকা পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বৈঠকে বিমানের পক্ষ থেকে সংস্থাটির কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রতিবেদন পেশ করা হয়। সেখানে ফ্লাইট বিলম্বিত হওয়ার কিছু কারণ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক চেক-ইন কাউন্টার পর্যাপ্ত না হওয়ায় সময়মতো কাউন্টার বন্ধ করা সম্ভব হয় না, যার ফলে ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। এছাড়া একই গেটে একাধিক ফ্লাইট দেওয়া হয়, বোর্ডিং ব্রিজের স্বল্পতা রয়েছে এবং ডিপারচার ব্যাগেজ এরিয়ায় জায়গার অভাব রয়েছে। পাশাপাশি আগমনী বেল্টের সংখ্যাও কম এবং অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে মাত্র চারটি চেক-ইন কাউন্টার রয়েছে বলে জানানো হয়।

বৈঠকটিতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। কমিটির সদস্যদের মধ্যে বৈঠকে অংশ নেন হুইপ মিয়া নূরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, খোন্দকার আবু আশফাক, মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন।