বোয়িং ও এয়ারবাস থেকে মোট ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তবে এই বিশাল পরিমাণ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই বা সমীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং ক্রয় নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদীয় কমিটি। রোববার সংসদ ভবনে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি উত্থাপিত হয়।

বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে মোট ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি বোয়িং এবং ৫টি ড্যাশ-৮। চলতি বছরের মধ্যে দুই পৃথক দফায় যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন করেছে বিমান। পাশাপাশি ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গে আরও ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করা হয়েছে।

বৈঠকে নতুন উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি সামনে আনেন কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য কামরুল হাসান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে কি না, এত উড়োজাহাজ প্রয়োজন আছে কি না বা এত যাত্রীর চাহিদা আছে কি না, ক্রয় নীতিমালা মেনে উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তিনি জানতে চেয়েছেন।” এর জবাবে বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখনই কোনো উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে না। এগুলো ৫–১০ বছর পর আসবে এবং বর্তমানে কেবল বুকিং দিয়ে রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান, উড়োজাহাজ কেনার জন্য রাজস্ব খাতের অর্থ ব্যয় হবে না, বরং বিমানের নিজস্ব পরিচালনা আয় থেকেই এই অর্থ সংস্থান করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, বৈঠকে মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ জানায় যে ৩৫টি উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনাটি কয়েকটি ধাপে বাস্তবায়িত হবে। সবকটি উড়োজাহাজ দেশে পৌঁছাতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই উড়োজাহাজ কেনার ব্যয় ‘সফট লোনের মাধ্যমে’ পরিশোধ করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং উড়োজাহাজ পরিচালনা থেকে প্রাপ্ত আয়ের মাধ্যমেই এই ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হবে বলে দাবি করা হয়।

বৈঠকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় নিয়েও সদস্যদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়। অতীতে বিমানের কেনাকাটা এবং তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান কয়েকজন সদস্য। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। এছাড়া বিমানবন্দরের ট্রলি সংকট নিয়েও আলোচনা হয়, যেখানে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ট্রলির সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হবে।

কমিটির সদস্য কামরুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে আরও জানান, বৈঠকে বিমানের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি বিমানবন্দরে ট্রলি সংকটের কথা উল্লেখ করেন এবং থার্ড টার্মিনালের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় ব্যয় কতটুকু বেড়েছে, তা জানতে চান। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরবর্তী বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পেশ করা হবে।

বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে গত আট মাসে সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং কেনাকাটার প্রতিবেদন দেওয়ার সুপারিশ করেছে। বৈঠকে গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, বিদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সিভিল এভিয়েশন, বিমান ও পর্যটনের কেনাকাটা, বদলি, নিয়োগ এবং বিমানবন্দরের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকির লক্ষ্যে কমিটি পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি সাব-কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পরিপূরক হিসেবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে কমিটি। কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী মন্ত্রণালয়ের স্বার্থে যোগ্যতাসম্পন্ন জনবলকে সঠিক জায়গায় পদায়নের সুপারিশ করেন।

কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, জসীম উদ্দীন আহমেদ, সুরাইয়া জেরিন, শওকত আরা আক্তার, মো. কামরুল হাসান ও মো. আবু তালিব। বিশেষ আমন্ত্রণে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন।