ইউরোপীয় উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ সরকার। আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কুর্মিটোলার একটি হোটেলে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বিমান পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং এয়ারবাসের মধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। এর আগে মার্কিন প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করার পর এবার এয়ারবাসের সঙ্গে এই নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হলো সংস্থাটি।
‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শিরোনামের এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার। উভয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন এবং এয়ারবাসের প্রতিনিধি জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির আওতায় এয়ারবাস থেকে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কেনা হবে। এর মধ্যে প্রশস্ত কাঠামোর এ৩৫০-৯০০ মডেলের বিমানগুলো মূলত দূরপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে এবং সরু কাঠামোর এ৩২১নিও বিমানগুলো আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে ব্যবহৃত হবে। তবে ১০টি উড়োজাহাজ ক্রয়ের জন্য মোট কত অর্থ ব্যয় করা হবে, সে বিষয়ে বিমান বা এয়ারবাস কোনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করেনি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০৩৩ সাল থেকে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে পারে। পর্যায়ক্রমে ২০৩৬ বা ২০৩৭ সাল পর্যন্ত এসব উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যুক্ত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বর্তমানে দেশের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ যাত্রী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মাধ্যমে যাতায়াত করেন, বাকি ৮০ শতাংশ যাত্রী বহন করে বিদেশি ও অন্যান্য এয়ারলাইনস। যাত্রীর চাহিদা বাড়লেও বিমানের বহরে উড়োজাহাজের সংকট রয়েছে। এ কারণে বিমানের বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ করে অন্তত ৫০ শতাংশ বাংলাদেশি যাত্রীকে নিজস্ব উড়োজাহাজে বিদেশে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে চান তিনি। মন্ত্রী আরও বলেন, ‘সঠিক নেটওয়ার্কের জন্য সঠিক বহর, সঠিক অবকাঠামো ও সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। আমরা বিমানকে বিশ্বের অন্যতম সেরা এয়ারলাইনস হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।’
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার বলে জানান বিমানমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, এ জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের এই খাতে উৎসাহিত করে তিনি বলেন, ‘ইউরোপের যে কেউ এসে এই প্রকল্পে অংশ নিতে পারেন।’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির অনুষ্ঠানে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন্ধুদের খুশি করতে নয়, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের প্রয়োজন মেটাতেই এয়ারবাসের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করা হয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ‘এই সরকার এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি করেছে, কারণ এটি আমাদের এভিয়েশন খাতের প্রয়োজন মেটায়। বাংলাদেশ কাউকে খুশি করার জন্য চুক্তি করে না, প্রয়োজনের ভিত্তিতে করে। যেখানে ব্যবসায়িক যৌক্তিকতা ও প্রয়োজন আছে, সেখানে আমরা চুক্তি করব—সেটি এয়ারবাসের সঙ্গে হোক বা বোয়িংয়ের সঙ্গে।’
এয়ারবাসের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গিয়োম ফোরি ভিডিও বার্তায় বলেন, বিমানের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে এয়ারবাস ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং বাংলাদেশে এভিয়েশন খাতের সামগ্রিক অবকাঠামো ও পরিবেশ উন্নয়নে সহযোগিতা করবে।
ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে; বিশেষ করে বাণিজ্য, পর্যটন ও বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়াতে এ খাতের উন্নয়ন জরুরি। তিনি মনে করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের মধ্যে ভবিষ্যতে নতুন সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।
যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক বলেন, বিমানকে আধুনিক বহর, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে এই অংশীদারত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্যেও যুক্তরাজ্য সহযোগিতা করবে।
জার্মানির রাষ্ট্রদূত রুডিগার লোটজ বলেন, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়; বরং বাংলাদেশ ও ইউরোপের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের দৃশ্যমান প্রতীক।
ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে বিমানের চুক্তি শুধু ১০টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও প্রকৌশল সহায়তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজও রয়েছে, যা নতুন উড়োজাহাজগুলো দ্রুত ও সফলভাবে বহরে যুক্ত করতে সহায়তা করবে।
স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়েগা ওচহোওয়া দি চিনচিত্রু বলেন, বাংলাদেশের আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নে এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও এর সদস্যদেশগুলো বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে।
এয়ারবাস ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জুর্গেন ওয়েস্টারমায়ার জানান, বিমান যে চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও উড়োজাহাজ কিনছে, তা বহর আধুনিকায়নের পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রুট চালুর সুযোগ তৈরি করবে। তিনি বলেন, এ৩৫০-৯০০ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দূরপাল্লার বাজারে এবং এ৩২১নিও দিয়ে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক বাজারে সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রুমি এ হোসেন বলেন, নতুন উড়োজাহাজের পাশাপাশি প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা, পাইলট-কেবিন ক্রু ও গ্রাউন্ড স্টাফদের প্রশিক্ষণ এবং যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে বিমান বিনিয়োগ করছে। যাত্রীদের দৃশ্যমান উন্নতি শিগগিরই দেখা যাবে উল্লেখ করে রুমি এ হোসেন বলেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে সেবায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কাইজার সোহেল আহমেদ বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি বিমানের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি জানান, এ সিদ্ধান্ত এসেছে বহর, রুট ও আর্থিক কৌশল নিয়ে কঠোর মূল্যায়ন এবং স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের পর।
উল্লেখ্য, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির আগে চলতি বছর দুই দফায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে মোট ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে বিমান। গত ৩০ এপ্রিল প্রথম দফায় প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে (প্রায় ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা) ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এর মধ্যে আটটি ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ও চারটি ৭৩৭-৮ ছিল। দ্বিতীয় দফায় গত ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই হয়, যার মধ্যে পাঁচটি ৭৮৭-১০ ও ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স রয়েছে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ আসা শুরু হতে পারে ২০৩১ সালে এবং সব উড়োজাহাজ পেতে ১১ থেকে ১২ বছর সময় লাগবে।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি বোয়িং ও ৫টি ড্যাশ-৮। তবে বহরের দুটি উড়োজাহাজ প্রায় অচল হয়ে পড়ার অবস্থায় রয়েছে এবং বাকি ১৭টিও আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বহর থেকে বাদ পড়বে। এই তাৎক্ষণিক চাহিদা মেটাতে বিমান আরও ১০টি উড়োজাহাজ ভাড়া (লিজ) নেওয়ার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত সফল হয়নি।
এয়ারবাসের ১০টি এবং বোয়িংয়ের ২৫টি উড়োজাহাজ যোগ হলে আগামী বছরগুলোতে বিমানের বহরে নতুন উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৫–এ। বর্তমানের ১৯টি উড়োজাহাজ মিলিয়ে মোট বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা ৫০ ছাড়াবে। বর্তমানে বিমানের বহরের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের তৈরি। এয়ারবাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হলে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দুই নির্মাতার উড়োজাহাজ নিয়ে বহর পরিচালনা করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।