বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে নিজেদের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী করে তুলছে আফগানিস্তান। এক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার জন্য আপ্রাণ লড়াই করা এই দেশটি এখন একের পর এক প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট শক্তিকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। এবার ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে গেছে রশিদ খানদের দল। শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো ষষ্ঠ স্থানে জায়গা করে নিয়েছে আফগানিস্তান। এই তালিকায় তাদের পেছনে এখন অবস্থান করছে ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলগুলো।

সোমবার (২ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে আফগানিস্তানের এই ঐতিহাসিক সাফল্যের কথা জানানো হয়েছে। ২০০৯ সালে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেকের পর দীর্ঘ ১৭ বছরের পথচলায় এই প্রথম বিশ্বের সেরা ছয় দলের তালিকায় নাম লেখাল তারা।

আইসিসির সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, আফগানিস্তানের রেটিং ৯৪। মজার বিষয় হলো, সমান রেটিং থাকা সত্ত্বেও শ্রীলঙ্কা সপ্তম স্থানে নেমে গেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ রেটিংয়ের হিসাবে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় ষষ্ঠ স্থানটি দখল করেছে আফগানরা। অন্যদিকে, ৯৩ রেটিং নিয়ে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে ইংল্যান্ড।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের অবস্থান আরও নিচে নেমে গেছে। ৮১ রেটিং নিয়ে নবম স্থানে রয়েছে টাইগাররা। অর্থাৎ, রেটিং পয়েন্টের হিসেবে আফগানিস্তানের চেয়ে ১৩ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। তালিকার দশম স্থানে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের রেটিং ৭৯।

আফগানিস্তানের এই অভাবনীয় উন্নতি হঠাৎ করে ঘটেনি, বরং সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমেই তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। গত আগস্টে আয়ারল্যান্ডের মাটিতে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে ৪-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে রশিদ খানরা। সিরিজের একটি ম্যাচে কোনো ফল না আসলেও বাকি চারটি ম্যাচেই জয় পায় সফরকারীরা।

এরপর গত অক্টোবরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আয়োজিত ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজেও অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় আফগানিস্তান। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই জিম্বাবুয়েকে ১৫৮ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে তারা। এরপর বাংলাদেশের বিপক্ষে ৭ উইকেটের দাপুটে জয় তুলে নেয় আফগানরা।

সেই ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে মাত্র ১৬০ রানে অলআউট হয়েছিল টাইগাররা। জবাবে ৩৫ দশমিক ৩ ওভারে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়েই লক্ষ্যে পৌঁছে যায় আফগানিস্তান। বাংলাদেশের বিপক্ষে এই একপেশে জয় তাদের ধারাবাহিক উন্নতির একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালেও নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখে আফগানিস্তান। জিম্বাবুয়েকে ১৬৯ রানে আটকে দিয়ে ৭ উইকেটের জয় ছিনিয়ে নেয় তারা। ২৩ অক্টোবরের সেই শিরোপা জয়ের পর ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে সপ্তম স্থানে উঠেছিল আফগানরা।

এরপর পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত আরেকটি ত্রিদেশীয় সিরিজের ফলাফলে বদলে যায় র‍্যাঙ্কিংয়ের সমীকরণ। ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হয় শ্রীলঙ্কা। সিরিজ শেষে লঙ্কানদের রেটিং ৯৫ থেকে কমে ৯৪-এ নেমে আসে। আর এই সুযোগেই তাদের টপকে ষষ্ঠ স্থানে উঠে যায় আফগানিস্তান।

র‍্যাঙ্কিংয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আফগানিস্তানের ৩১ ম্যাচে মোট পয়েন্ট ২ হাজার ৯২৬। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার ৪৪ ম্যাচে পয়েন্ট ৪ হাজার ১৪৪।

আফগান ক্রিকেটের এই উত্থানের গল্প শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। সে বছরের ১৯ এপ্রিল দক্ষিণ আফ্রিকার বেনোনিতে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে খেলে তারা। অভিষেক ম্যাচেই ৮৯ রানের বড় জয় পেয়েছিল দলটি।

এরপর ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে আফগানরা। ২০১৭ সালে আইসিসির পূর্ণ সদস্যের মর্যাদা পাওয়ার পর তাদের অগ্রযাত্রা আরও গতি পায়। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ধারাবাহিকভাবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে লড়াই করার সামর্থ্য দেখিয়েছে তারা।

২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে সেই সামর্থ্যের বড় প্রমাণ দেয় আফগানিস্তান। ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলগুলোকে হারিয়ে ক্রিকেটবিশ্বে আলোড়ন তোলে তারা। সেমিফাইনালে উঠতে না পারলেও পুরো টুর্নামেন্টে আফগানদের পারফরম্যান্স ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়।

পরের বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আরও বড় সাফল্য আসে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় আফগানিস্তান। এবার ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়েও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল তারা।

আইসিসির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৯১টি ওয়ানডে খেলেছে আফগানিস্তান। এর মধ্যে ৯৬ ম্যাচে জয় পেয়েছে দলটি। অভিষেকের পর থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে আসা আফগানদের জন্য ষষ্ঠ স্থানে ওঠা তাই এক বিশেষ অর্জন।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের জন্য সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিং কিছুটা হতাশাজনক। দীর্ঘদিন ধরে ওয়ানডেকে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী সংস্করণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি টাইগাররা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ত্রিদেশীয় সিরিজেও দুই ম্যাচের দুটিতেই হেরে বিদায় নিয়েছিল বাংলাদেশ।

সর্বশেষ তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভারত। ১১৫ রেটিং নিয়ে সবার ওপরে রয়েছে তারা। দ্বিতীয় স্থানে নিউজিল্যান্ড (১০৯) এবং তৃতীয় স্থানে দক্ষিণ আফ্রিকা (১০৪)। সমান ১০৪ রেটিং নিয়ে চতুর্থ স্থানে পাকিস্তান। পঞ্চম স্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়ার রেটিং ১০২।