আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে ২০০ উইকেটের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন আফগানিস্তানের তারকা লেগ স্পিনার রশিদ খান। শারজায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে এই অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। ১৯ রানে জয়লাভ করা ওই ম্যাচে তাদিনাওয়াশে মারুমানিকে এলবিডব্লু করার মাধ্যমে ২০০ উইকেটের ক্লাবে নাম লেখালেন ২৮ বছর বয়সী এই স্পিনার।
রশিদের এই যাত্রার পেছনে রয়েছে এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম বোলার হিসেবে ৫০ উইকেট নিয়েছিলেন পাকিস্তানের সাবেক অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদি। ক্রিকইনফোর তথ্য অনুযায়ী, তখন রশিদের বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। কিশোর রশিদের মনে টিভি পর্দায় আফ্রিদির বোলিং দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। সেই বয়সে ব্যাটিংয়ে পারদর্শী হলেও তিনি ধীরে ধীরে আফ্রিদির মতোই লেগ স্পিনে দক্ষতা অর্জন করেন। ১৬ বছর পর সেই কিশোর আজ এমন এক উচ্চতায় পৌঁছেছেন, যা দেখে শুধু তার আদর্শ আফ্রিদিই নন, বরং সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীরাই আনন্দিত হবেন।
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে রশিদ অনেক আগে থেকেই অন্যতম সেরা বোলার হিসেবে পরিচিত। তবে এবার তিনি নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। নারী ও পুরুষ ক্রিকেট মিলিয়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম বোলার হিসেবে ২০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করার গৌরব অর্জন করলেন তিনি। এর আগে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম বোলার হিসেবে ১০০ উইকেট নিয়েছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ নারী দলের স্পিনার আনিসা মোহাম্মদ। দুই বছর আগে ১৫০ উইকেটের প্রথম মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি বোলার টিম সাউদি। তবে গত বছর সেপ্টেম্বরে সাউদিকে পেছনে ফেলে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিরত হন রশিদ। আর এবার তিনি প্রথম বোলার হিসেবে ২০০ উইকেটের দেখা পেলেন।
১১ বছরের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ১২০ ইনিংসে রশিদের শিকার এখন ২০০টি। তাঁর বোলিং গড় ১৪.৬ এবং ইকোনমি রেট ৬.১৪। গড়ে প্রতি ১৩.৭টি ডেলিভারির ব্যবধানে একটি করে উইকেট নিয়েছেন তিনি। রশিদের এই অসাধারণ সাফল্যের গভীরতা বোঝা যায় তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইংল্যান্ডের লেগ স্পিনার আদিল রশিদের পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা করলে। আদিলের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার ১৭ বছরের। এই দীর্ঘ সময়ে ১৪৬ ইনিংসে তাঁর শিকার ১৭১ উইকেট, যার গড় ২৩.৪২ এবং ইকোনমি রেট ৭.৫৬। আদিল প্রতি ১৬.৫ ডেলিভারির ব্যবধানে একটি উইকেট নিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ উইকেটের তালিকায় শীর্ষ চারজনের সবাই স্পিনার, যাদের মধ্যে তিনজনই লেগ স্পিনার। এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন হংকংয়ের অফ স্পিনার এহসান খান, যিনি ১১৬ ইনিংসে ১৬৫ উইকেট নিয়েছেন। চতুর্থ স্থানে নিউজিল্যান্ডের লেগ স্পিনার ইশ সোধি, যিনি ১৩৫ ইনিংসে এহসানের সমান ১৬৫টি উইকেট শিকার করেছেন।
রশিদের এই ২০০ উইকেটের মধ্যে ১৫০টিই এসেছে এশিয়ার মাটিতে, যা এই মহাদেশের যেকোনো বোলারের জন্য সর্বোচ্চ। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতেই তিনি পেয়েছেন ৭৯টি উইকেট, যা নির্দিষ্ট একটি দেশে সর্বোচ্চ উইকেট নেওয়ার তালিকায় তৃতীয়। নিউজিল্যান্ডে ৬৬ ইনিংসে ৯১ উইকেট নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন টিম সাউদি। মালয়েশিয়ার স্পিনার বিরানদীপ সিং নিজ দেশের মাটিতে ৬৭ ইনিংসে ৮৯ উইকেট নিয়েছেন, এরপরই আরব আমিরাতে রশিদের উইকেট সংখ্যা।
রশিদের ২০০টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি উইকেটের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৪২টি উইকেট এসেছে মাঝের ওভারে (৭ থেকে ১৬ ওভার) এবং ৫৬টি উইকেট এসেছে ডেথ ওভারে (১৭ থেকে ২০ ওভার)। পাওয়ার প্লে বা প্রথম ছয় ওভারে তিনি মাত্র দুটি উইকেট নিয়েছেন, তবে এই সময়ে তিনি খুব বেশি বোলিং করেননি; মোট ১০২টি বল করেছেন মাত্র।
স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও উইকেটের পাহাড় গড়ছেন রশিদ। গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বোলার হিসেবে স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে ৭০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে ডোয়াইন ব্রাভোর রেকর্ড ভেঙে এই সংস্করণের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি হওয়ার পর থেকে তিনি দ্রুত গতিতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন।
১১ বছরের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ৫৪৬ ইনিংসে রশিদের মোট শিকার ৭৪২ উইকেট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সুনীল নারাইনের ক্যারিয়ার ১৫ বছরের, ৬০৭ ইনিংসে তাঁর শিকার ৬৫৮ উইকেট। আর তৃতীয় স্থানে থাকা ব্রাভো ৫৪৬ ইনিংসে ৬৩১ উইকেট নিয়েছেন।