ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আবারও রাজপথে নেমেছেন পোশাক শ্রমিকেরা। আজ সোমবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে তাঁদের এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের ফলে মহাসড়কের দুই পাশে অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, বেলা পৌনে ১১টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকা এবং পরবর্তীতে মিরপুর-২ নম্বর স্টেডিয়াম সংলগ্ন প্রশিকা মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বেলা ১১টার দিকে পুলিশ যখন তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তখন পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এর আগে গতকাল ১ নভেম্বর, রোববার কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর বাজার, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং সড়ক অবরোধ করেন। দিনভর উত্তেজনার মধ্যে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদাম এবং পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। এই ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। দিনব্যাপী এই বিক্ষোভ, অবরোধ ও সহিংসতার প্রভাবে অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে হয়। প্রায় ছয় ঘণ্টা পর মহাসড়কে যান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়।
এই অস্থির পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ২০ বছরের সার্বিক অবস্থার একটি মূল্যায়ন করেছে মুক্তকণ্ঠ। প্রথমেই মজুরি বৃদ্ধির ইতিহাস পর্যালোচনা করা যাক।
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য ১৯৯৪ সালে সরকার প্রথমবারের মতো নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করে। সেই বোর্ড ৯৩০ টাকা নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে শ্রমিকদের মজুরি বাড়িয়ে ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। এরপর ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে তৈরি পোশাকশিল্পে নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়।
২০২৩ সালের সেই সময়ে শ্রমিকেরা ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা মজুরির দাবি জানিয়েছিলেন। ওই বছরের ১ ডিসেম্বর মজুরি কাঠামো কার্যকর করার আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল। মজুরি বোর্ড মোট ছয়টি সভা করার পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ১২ হাজার ৫০০ টাকা নিম্নতম মজুরির সুপারিশ করে। এরপর ডিসেম্বরে সরকার চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট ছবিতে প্রদর্শিত হয়েছে।
গত তিন বছরে বাজারে দ্রব্যমূল্যের যে লাগামহীন বৃদ্ধি ঘটেছে, তার বিপরীতে ২০২৩ সালের ১২ হাজার ৫০০ টাকার বর্তমান মূল্য কত? হিসাব অনুযায়ী তা এখন ৯ হাজার ৬৮৭ টাকার সমান। প্রশ্ন জাগে, এই সামান্য টাকায় কি একটি পরিবারের ভরণপোষণ সম্ভব? একটি পরিবারের মাসিক খরচের প্রকৃত চিত্রটি সংশ্লিষ্ট ছবিতে তুলে ধরা হয়েছে।
ছবিতে বিভিন্ন এলাকাভেদে একটি পরিবারের মাসিক খরচের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৫ সালে ৩ হাজার পরিবারের ওপর একটি জরিপ চালিয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তকণ্ঠের সংবাদের জানা যায়, গ্রামাঞ্চলের একটি পরিবারের মাসিক গড় খরচ ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা এবং শহরাঞ্চলে তা ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা। এর অর্থ হলো, ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরিতে গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক খরচের মাত্র ৩৫ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে প্রায় ৩৮ শতাংশ ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব হয়।
তবে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) প্রকাশিত এক গবেষণায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ওই গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিবারের গড় খরচ ২০ হাজার ৮২৬ টাকা। এই খরচের খাতগুলো বিস্তারিতভাবে নিচের ছবিতে দেখানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বাজারের সার্বিক চিত্রও নিচের ছবিতে দেওয়া হয়েছে, যা থেকে শ্রমিকদের এবং সাধারণ পরিবারের খরচের একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়।
২০২৩ সালে এপ্রিল মাসে বোর্ড গঠন থেকে ৭ নভেম্বর মজুরি চূড়ান্ত হতে প্রায় সাত মাস সময় লেগেছিল। সংশোধিত শ্রম আইন (নভেম্বর ২০২৫) অনুযায়ী, এবার ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নতুন কাঠামো আসার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত গত ১ নভেম্বর, মিরপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের দিনে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।
এই বিষয়ে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শ্রমিকনেত্রী নাজমা আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মজুরি বোর্ড গঠন করতে সরকারের বিলম্ব হয়েছে। সে জন্য শ্রমিকদের একটি অংশ আন্দোলনে নেমেছেন। এখন আমাদের চাওয়া, যত দ্রুত সম্ভব আলোচনা করে নতুন মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করা হোক।’