ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুরে পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা আজ রোববার সকাল ৯টার দিক থেকে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেন। এই আন্দোলনের এক পর্যায়ে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকদের অবরোধের কারণে প্রায় ছয় ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে, যা বেলা তিনটা থেকে পুনরায় চালু হয়।
বিক্ষোভ চলাকালীন বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়। দফায় দফায় শ্রমিক ও পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া শ্রমিকদের হামলায় তিন সংবাদকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
শিল্প পুলিশ ও শ্রমিকদের সূত্রে জানা গেছে, আজ সকাল থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক এবং মহানগরীর কোনাবাড়ী, ভোগড়া ও নাওজোড় এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের এই আন্দোলনের ফলে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে শত শত শ্রমিক মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।
শ্রমিকদের এই বিক্ষোভের সময় কোনাবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের পাশে থাকা একটি পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দুপুরের দিকে উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকার ট্রপিক্যাল লিমিটেড নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদামেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি পুলিশের একটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব ঘটনায় আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে থানা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। বিপরীতে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে প্রায় ২৫ জন শ্রমিক আহত হন। আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের আন্দোলনের ছবি ও সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলায় দীপ্ত টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম, এনটিভির কালিয়াকৈর প্রতিনিধি আবু সাঈদ ও স্থানীয় ফটোসাংবাদিক রিয়াজুল ইসলাম আহত হয়েছেন।
শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়লে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার অর্ধশতাধিক পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। সকালে কাজে যোগ দিতে আসা শ্রমিকদের অনেকেই পরে এই আন্দোলনে যোগ দেন। কারখানা ছুটি ঘোষণার পর শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তারা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে অগ্নিসংযোগ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালান।
স্থানীয় ডিভাইন টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক মো. খাইরুল বলেন, “বাজারে জিনিসপত্রে দামের যে অবস্থা, তাতে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়ি ভাড়া, খাবার ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাধ্য হয়েই তাঁরা রাস্তায় নেমেছেন। তাঁরা কাজ করতে চান, বেঁচে থাকার মতো বেতন চান।”
এর আগে গতকাল শনিবারও একই দাবিতে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ ও আনসার একাডেমির আশপাশে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। সেদিন শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন এবং অন্তত ১৫টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। গতকাল অন্তত ২০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূইয়া জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
আজ দীর্ঘ সময় মহাসড়কে অবরোধ থাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল পথে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন আটকা পড়ে। এতে যাত্রী ও পরিবহনশ্রমিকদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক যাত্রী বাস থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন।
সফিপুর এলাকায় আকবর আলী নামের এক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি বলেন, “জরুরি কাজে ঢাকায় যাচ্ছিলাম। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের কারণে গাড়ি একদম চলছিল না। পরে বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে হেঁটে অনেকটা পথ যেতে হয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের কথা কেউ ভাবছে না।”
মরিয়ম বেগম বলেন, “ছোট সন্তানকে নিয়ে বাসে বসে ছিলেন। প্রচণ্ড গরমে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। শ্রমিকদের দাবি থাকলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা উচিত। এভাবে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করা ঠিক নয়।”
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, “শ্রমিকদের আন্দোলনের সময় ৫ থেকে ৬টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। একটি কারখানার গোদামে অগ্নিসংযোগ করা হলেও সেটি শ্রমিকেরা নাকি দুর্বৃত্তরা দিয়েছে, সেটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা ইট–পাটকেল ছুড়তে থাকলে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।”
দুপুরে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে সরকার। শ্রমিকদের মাঝে সেই খবর না পৌঁছানোয় তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। পরে গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান প্রথমে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ভোগড়া ও নাওজোড় এলাকায়, পরে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর ও চন্দ্রা এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের সড়ক থেকে ফেরত পাঠান। তিনি বলেন, “শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর জন্য সরকার পূর্ব নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই মজুরি বোর্ড গঠন করেছে।” তিনি আশা করছেন, শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ হবে।