পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং তাঁদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষায় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে শ্রমিকদের এই আন্দোলনকে পুঁজি করে রাজধানীর মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরে যে সহিংস পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, তার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

আজ রোববার সন্ধ্যায় সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা প্রদান করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

মূলত পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি ঘিরে সৃষ্ট বিক্ষোভ, পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এবং সামগ্রিক উদ্ভূত পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে যারা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনিভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা পেয়েছি। ইতিমধ্যে সব বাহিনীকে সে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেকে এ অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিছু আওয়ামী লীগ-সমর্থক ব্যবসায়ীরও ইন্ধন ছিল। আমরা তাঁদের চিহ্নিত করেছি।’

সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে পোশাকশ্রমিকদের এই আন্দোলন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল সরকার। এই বিক্ষোভ কি শ্রমিকদের প্রকৃত অসন্তোষ থেকে তৈরি হয়েছে, নাকি এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে—তা খতিয়ে দেখা হয়। সরকার নিশ্চিত হয়েছে যে, এই আন্দোলনের নেপথ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। এই ঘটনায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ-সমর্থক ব্যবসায়ীদের মালিকানাধীন অধিকাংশ পোশাক কারখানা সকাল সকাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যাতে শ্রমিকেরা সহজেই রাস্তায় নেমে আসতে পারেন এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যানুসারে, ঢাকা ও গাজীপুরের শ্রমিক বিক্ষোভে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগসহ তাদের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়েছেন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ছাত্রলীগের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজমুল ইসলাম একটি মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনায় সেখান থেকে আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে এসব সংগঠনের আরও ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আজ দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেন শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এ সময় পোশাকশিল্পের চলমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে শ্রমমন্ত্রী তাঁর পূর্বনির্ধারিত সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর বাতিল করতে বাধ্য হন। এর আগে সকালে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন শ্রমমন্ত্রী।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সরকার আগেই সংবাদমাধ্যম এবং শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় রোববার মজুরি বোর্ড গঠনের কথা জানিয়েছিল। এরপরও শ্রমিকদের সড়কে অবস্থানের কারণে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে।’ এই বক্তব্যের পাশাপাশি তিনি আন্দোলনরত শ্রমিকদের দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।