চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার হ্রাস পাওয়াকে কোনোভাবেই বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে যে ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, তার সাময়িক প্রভাব পাসের হারে পড়েছে। তবে তিনি আশাবাদী যে, আগামী পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার পুনরায় বৃদ্ধি পাবে।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর তা বিশ্লেষণ এবং পরবর্তী করণীয় বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় উপাচার্য এসব কথা বলেন। উল্লেখ্য, এ বছর এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

ফলাফলে পাসের হার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, ‘এইচএসসি পরীক্ষায় যে ফলাফল হয়েছে, সেটিকে আমি ফল বিপর্যয় মনে করি না। এটাকে স্বাভাবিক ফলাফলই বলব। শিক্ষার্থীদের যেভাবে শেখানো, গাইড করা এবং এইচএসসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা দরকার ছিল, হয়তো আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা করতে পারিনি। এ জন্য শিক্ষার্থীদের দোষ দিতে চাই না। আমাদের অক্ষমতাগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।’

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষার উদাহরণের কথা উল্লেখ করে উপাচার্য জানান, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় পাস কোর্স এবং প্রিলিমিনারি টু মাস্টার্স পরীক্ষায় পাসের হার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এমনকি অনার্স পরীক্ষায় পাসের হারও এখন ৬০ শতাংশের নিচে। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অধিক গুরুত্ব প্রদান, পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং শিক্ষকদের জবাবদিহির আওতায় আনার ফলে ফলাফলে এই পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার মানোন্নয়নের উদ্যোগের অংশ হিসেবেই পরীক্ষার মূল্যায়ন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও পরীক্ষার প্রস্তুতি ও খাতা মূল্যায়নের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে দ্রুত অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই এই পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে অধ্যাপক আমানুল্লাহ বলেন, “আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না। বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ কখনো ছিল না। এ বছর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই পদ্ধতি চালু করেছেন, এতে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে উপকৃত হবে। আমি মন্ত্রীকে এ জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান একটি বছর নষ্ট হবে না। বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ এবং খাতা পুনর্মূল্যায়নের ফলে আরও অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবে বলে আমি আশা রাখি। এসব প্রক্রিয়া শেষে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।”

ফলাফলের কারণে হতাশ না হয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান উপাচার্য। বিশেষ করে উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোর অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের প্রতি তিনি অনুরোধ করেন। উপাচার্য বলেন, যেসব কলেজে শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব কলেজের অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে বসে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ বের করা। কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না। বরং তাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে হবে। কলেজের নিয়মিত সময়ের বাইরে এবং শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি অকৃতকার্য হয়েছে, সেসব বিষয়ের শিক্ষকদের বাড়তি সময় দিয়ে শিক্ষার্থীদের তৈরি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো বিবেচনা করে শিক্ষকদের এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে বিনা সম্মানীতে অতিরিক্ত পাঠদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে হবে। আগামী এক–দুই মাস শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তরিকভাবে কাজ করলে অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীসংখ্যা আবার বাড়বে।

উপাচার্য আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে পাসের হার বেড়ে যাবে। এখন শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে, পাস করতে হলে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষকেরাও বুঝেছেন, তাঁদের কী করণীয়। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।’ তিনি উল্লেখ করেন যে, সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার সংযোগ এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আসছে। এই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সাময়িকভাবে পাসের হার কমলেও ভবিষ্যতে এসএসসি, এইচএসসি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় পাসের হার বাড়বে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।