দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় এক হতাশাজনক চিত্র সামনে এসেছে। বোর্ডের মোট শিক্ষার্থীর অর্ধেকের বেশি ফেল করেছেন এবং মোট ৪৯টি কলেজ থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। এবারের ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এবার বোর্ডের মাত্র ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ৯৫৩ জন।

আজ শনিবার সকালে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক নূর আবদুর রাজ্জাক এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই সব তথ্য প্রকাশ করেন। উক্ত ব্রিফিংয়ে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বোরহান উদ্দিন, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক জহুরুল ইসলাম প্রামাণিক ও জহিরুল ইসলাম, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রেজাউল করিম চৌধুরী এবং শিক্ষা বোর্ড কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মওদুদুল করিমসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

দিনাজপুর বোর্ড সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, রংপুর বিভাগের ৮টি জেলার মোট ৬৬৮টি কলেজ থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৭৮৭ জন শিক্ষার্থী এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৫১ হাজার ৩৯৮ জন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ৫৪ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন।

গত পাঁচ বছরের ফলাফলের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১ সালে এই বোর্ডে পাসের হার ছিল সর্বোচ্চ ৯২ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে এই হার কমতে থাকে। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা দাঁড়িয়েছিল ৫৭ দশমিক ৪৯ শতাংশে। জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৩৪৯ জন জিপিএ-৫ পেলেও ২০২২ সালে তা কমে হয় ১১ হাজার ৮৩০ জন, ২০২৩ সালে ৬ হাজার ৪৫৯ জন, ২০২৪ সালে ১৪ হাজার ২৯৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৬ হাজার ২৬০ জন। আর এবার সেই সংখ্যাটি নেমে এসেছে ২ হাজার ৯৫৩ জনে।

বিভাগীয় ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবিক বিভাগের ২৬ হাজার ৩০৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৭ হাজার ৫৬৩ জন পাস করেছেন, যার পাসের হার ৬৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। বিজ্ঞান বিভাগের ৭৮ হাজার ৩৪৮ জনের মধ্যে পাস করেছেন ৩১ হাজার ২৮৬ জন, অর্থাৎ পাসের হার মাত্র ৩৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৭ হাজার ১৩৫ জনের মধ্যে পাস করেছেন ২ হাজার ৫৪৯ জন, যার পাসের হার ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। জিপিএ-৫ পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা; এই বিভাগে ২ হাজার ৯৪ জন, মানবিক বিভাগে ৭৯২ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে মাত্র ৬৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

লিঙ্গভিত্তিক ফলাফলে এবারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েরাই এগিয়ে। মোট ৫৩ হাজার ৫০৮ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছেন ২২ হাজার ১০৬ জন, যার পাসের হার ৪১ দশমিক ৩১ শতাংশ। বিপরীতে ৬০ হাজার ২৮ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছেন ২৯ হাজার ২৯২ জন, যার পাসের হার ৫০ দশমিক ২৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের মধ্যে ১ হাজার ৫৭০ জন মেয়ে এবং ১ হাজার ৩৮৩ জন ছেলে রয়েছেন।

বোর্ডের অধীনে আটটি জেলার মধ্যে পাসের হারে শীর্ষে রয়েছে রংপুর জেলা, যেখানে পাসের হার ৫৬ দশমিক ১২ শতাংশ। সবচেয়ে করুণ অবস্থা পঞ্চগড়ে, যেখানে পাসের হার মাত্র ৩৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। অন্যান্য জেলার পাসের হার হলো— নীলফামারীতে ৪৯ দশমিক ৯২ শতাংশ, লালমনিরহাটে ৪৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৩ দশমিক ৮২ শতাংশ, কুড়িগ্রামে ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং গাইবান্ধায় ৩৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।

জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও রংপুর জেলা সবার আগে, যেখানে ১ হাজার ২৭৬ জন শিক্ষার্থী এই কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। সবচেয়ে কম জিপিএ-৫ পাওয়া পঞ্চগড়ে, যেখানে মাত্র ৫১ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এছাড়া নীলফামারীতে ৫৬১ জন, দিনাজপুরে ৪৭৬ জন, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৭৮ জন, গাইবান্ধায় ১৭৩ জন, কুড়িগ্রামে ১৩৬ জন এবং লালমনিরহাটে ১০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এবার ৮ জেলার ৬৬৮টি কলেজের মধ্যে ৪৯টি কলেজ থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রংপুর জেলার ৩টি, দিনাজপুরের ৬টি, ঠাকুরগাঁওয়ের ৯টি, নীলফামারীর ১২টি, গাইবান্ধার ২টি, লালমনিরহাটের ৬টি, কুড়িগ্রামের ৯টি এবং পঞ্চগড়ের ২টি কলেজ রয়েছে।

গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা কলেজের সংখ্যা প্রতি বছরই বাড়ছে। ২০২১ সালে এমন কলেজ ছিল মাত্র ২টি, ২০২২ সালে ১৩টি, ২০২৩ সালে ১৬টি, ২০২৪ সালে ২০টি এবং ২০২৫ সালে ৪৩টি। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯টিতে।

এ বিষয়ে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক নূর আবদুর রাজ্জাক বলেন, “বিগত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার বিষয়টিকে তাঁরা শিক্ষার মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে দেখছেন।” কোনো শিক্ষার্থী পাস না করা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “এ নিয়ে মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। কীভাবে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমানো যায়, এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এবার শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে না; সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যক্ষদের ডেকে সরাসরি ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হবে। প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন বাতিলের জন্য সুপারিশ করা হবে।”