‘প্রকৃতির জন্য তৎপরতা’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আর্মেনিয়ায় অনুষ্ঠিত হলো প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন। ওই সম্মেলনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে লেখা।
আর্মেনিয়ায় চারটি ঋতু—গ্রীষ্ম, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। এখন হেমন্ত। বিকেল হতেই শীত নামে, থাকে সকাল অবধি। রাজধানী ইয়েরেভানের খোরেনাৎসি এলাকায় মামান আন্না পরিবারের বাসায় আছি।
আর্মেনিয়ার ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাত ইতিহাসবিদ মুভসেস খোরেনাৎসির নামে এলাকাটির নাম হয়েছে।
আন্না পরিবারের দোতলা কাঠের ঘরে গলগল করে ঢুকে পড়ে হেমন্তের শীত। হুরাজদান নদীর অবিরল বাজনা ‘কলকল’ শব্দটির স্মৃতি জাগিয়ে দেয়।
খোরেনাৎসি থেকে রিপাবলিক স্কয়ার হয়ে প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনে যাওয়ার পথে ওক, বিচ, ম্যাপল, বাজ ও বুনো বাদামের পাতা ঝরা দেখি। প্রবীণ নারী-পুরুষেরা লম্বা ডাঁটির ঝাড়ু দিয়ে পাতা ঝাড়ু দেন।
আর্মেনিয়ার ঝরা পাতা আমাকে বাংলাদেশের মধুপুর শালবনে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট মান্দি নারীরা ঝরা শালপাতা কুড়াচ্ছিলেন।
বন বিভাগ পেছন থেকে গুলি করে। শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায় শিশিলিয়া স্নালের। ঝরা পাতা প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তুতন্ত্রের অন্যতম প্রাচীন সঙ্গী।
ঝরা পাতা বহু আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকার উৎস। জ্বালানি, থালা, ঠোঙা বানানো ছাড়াও কৃষিকাজে মালচিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
১৯৮০-এর দশক নাগাদ বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে কলা, পদ্ম ও আজুগিপাতায় খাবার পরিবেশন হতো উৎসব-অনুষ্ঠানে।
গুড়, লবণ, ছোট মাছের মতো সদাই পাতায় মুড়িয়ে দেওয়া হতো। দুম করে সব বদলে ফেলা হলো। ঝরা পাতা সরিয়ে সঙ্গ, সংসার ও সাকিন দখল করল প্লাস্টিক।
তালপাতার সেপাইসহ পাতার খেলনা বা বাঁশির কোনো স্মৃতি নেই জেন-জি প্রজন্মের। খেজুর বা হোগলাপাতার পাটিও উধাও। ভেন্নাপাতার ছাউনি কেবল পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’ কবিতাতেই প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হয়ে আছে।
রাতে শুকনা এপ্রিকট, ব্ল্যাকবেরি আর টমেটো খেতে খেতে আন্না পরিবারের কাছেও আর্মেনিয়ার শুকনা পাতার গল্প শুনি।
পাহাড়ি আভেলুকের লম্বা পাতা রোদে শুকিয়ে থালা বানানো হতো। বুনো ব্ল্যাকবেরির পাতা ভেষজ চা এবং ত্বকের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতো শুকনা চিনার পাতা।
ঠিক যেমন বাংলাদেশে শুকনা নিম বা কালোমেঘ পাতার বহু লোকায়ত ব্যবহার আছে। ঝরার আগে পাতারাই পৃথিবীর জন্য খাবার বানিয়ে শরীরে মজুত করে।
ঝরার পরে এই পাতারাই একদিন ফসিল বা জ্বালানি হয়ে যায়। মানুষ এই ফসিলের বাজার দখল করতেই ইকোসাইড ও জেনোসাইড তৈরি করে।
পাতার দখল নিয়েই ষাটের দশকে ‘সবুজ বিপ্লবের’ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চলমান প্রাণসংহারী অন্যায্য খাদ্যব্যবস্থা। প্রকৃতির প্রশস্ত পাতার ধানগাছ বাছাই করা হয়েছিল বেশি সূর্যের আলো ধারণ করে বেশি বেশি দানা তৈরির জন্য।
এই একতরফা চাপিয়ে দেওয়া বাছাই-বাহাদুরিই সর্বস্বান্ত করেছে প্রাণপ্রকৃতির ব্যাকরণ।
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন পাতার খেলা। বনজীবীরা বলেন, ঝরা পাতায় মেথানি আর নতুন পাতায় মধু। ঝরা পাতা জমে জমে ‘মেথানির স্তূপ’ তৈরি হয়, আর মেথানিতেই জন্ম হয় চিংড়ির।
জঙ্গলে নতুন পাতার জন্ম মধু মৌসুমের সূচনা করে। বনতলের ঝরা পাতার স্তূপ বহু প্রাণের আবাসস্থল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পাতাঝরার বিজ্ঞানকে জখম করা হচ্ছে।
ঝরা পাতার ওপর বন্য প্রাণী, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। আমাজন বন ও আন্দিজ পর্বতের মাঝে মানিকুই ও সাকিউর নদী অববাহিকায় বাস করেন শিমানি আদিবাসীরা।
বন থেকে জাতাতা ও মানাই পাতা সংগ্রহ করে চলে তাঁদের জীবন। কিন্তু এখন আর আগের মতো পাতা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনে আসা শিমানি প্রতিনিধি ইয়েসেনিয়া কারি মায়েরের সঙ্গে আলাপ হয় ‘ইনডিজেনাস অ্যান্ড লোকাল কমিউনিটিস’ প্যাভিলিয়নে।
ক্ষোভের সঙ্গে জানান, ‘কোম্পানির খনন, বনতল ধ্বংস ও বৃহৎ গবাদিখামারের জন্য প্রাচীন বনগুলো ধ্বংস হচ্ছে। আদিবাসী ও প্রাণবৈচিত্র্যের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। অথচ কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্কে (কেএমজিবিএফ) এসব রক্ষার ২৩টি বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বন বাঁচিয়ে আদিবাসীরা পাতা ও প্রাণসম্পদ সংগ্রহ করেন। লোকায়ত জ্ঞানের সামগ্রিক স্বীকৃতি প্রয়োজন।’
বন থেকে জাতাতা ও মানাই পাতা সংগ্রহ করে চলে তাঁদের জীবন। কিন্তু এখন আর আগের মতো পাতা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনে আসা শিমানি প্রতিনিধি ইয়েসেনিয়া কারি মায়েরের সঙ্গে আলাপ হয় ‘ইনডিজেনাস অ্যান্ড লোকাল কমিউনিটিস’ প্যাভিলিয়নে।
শিমানিদের কথা প্রতিধ্বনিত হয় বাংলাদেশের সুন্দরবনে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর বন বিভাগ জোর করে গোলপাতা আহরণ নিষিদ্ধ করেছিল।
প্রবীণ পাতাকাটনি বাওয়ালিরা বলেছিলেন, নিয়ম মেনে গোলপাতা না কাটলে গাছ মরে যায়।
মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া বন যখন মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টাল, শেভরন আর ইউনোকলের আগুনে পুড়ে যায়, তখন দগ্ধ বনতল দেখে আদিবাসী খাসি নারীরা চিৎকার করে কেঁদেছিলেন।
কারণ, ঝরা পাতার বনতল থেকে তেতস্লাং নামের এক বুনো মাশরুম তাঁরা সংগ্রহ করতেন। গ্রামের মানুষেরা বিশ্বাস করেন, রাতে গাছের পাতা ঘুমায়; সন্ধ্যার পর তাই পাতা ছেঁড়া নিষেধ।
বাঙালি হিন্দু, হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া, বানাই ও হদি সমাজে তুলসীপাতা তোলার আগে মন্ত্র পড়ে অনুমতি নিতে হয়।
পাতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত লোকায়ত বিজ্ঞানকে অস্বীকার ও আড়াল করে ঝরা পাতার কেবল কার্বন বা হিউমাস সঞ্চয়ের আলাপ প্রাণবৈচিত্র্য সনদের অঙ্গীকার পূরণ করতে পারে না।
লোকায়ত ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা ইয়েরেভানে অনুষ্ঠিত প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনের ১৭তম আসরের অন্যতম এজেন্ডা হলেও এসব বিষয়ে ন্যায্য ও অধিকারভিত্তিক কোনো বৈশ্বিক অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়নি।
কিন্তু সম্মেলনজুড়ে ১৯ থেকে ৩০ অক্টোবর প্রতিদিনের আলাপ-আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল প্রকৃতির মায়া ও লোকজ্ঞান সুরক্ষার প্রশ্ন।
উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে খনন ও কারখানার দূষণের কারণে বাংলাদেশের রাতারগুল জলাবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে লোচ মাছ।
হাওরাঞ্চল যেমন বিদায় নিয়েছিল নানিদ। সবুজ বিপ্লব প্রকল্প বাংলাদেশের শতসহস্র আদি ধানের জাত খুন করেছে। কেবল খুন বা জখম নয়, বিশ্বব্যাপী বহু প্রজাতি, বাস্তুতন্ত্র ও জাতিসত্তা স্বজনদের হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে মরণরেখায় দাঁড়িয়ে আছে।
স্বজনদের হারিয়ে যখন কোনো গাছ, প্রাণী বা জাতিসত্তা একা হয়ে যায়, তখন তাদের ‘এন্ডলিং’ বা ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃসঙ্গ প্রজাতি’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন নিঃসঙ্গ জীবন পাড়ি দিয়ে ফুল ফুটিয়ে ২০১০ সালে মারা যায় তালি পামগাছটি।
চিলির রবিনসন ক্রুস দ্বীপের ডেনড্রোসেরিস নেরিফোলিয়া, নিউজিল্যান্ডের থ্রি কিংস দ্বীপের পেনান্টিয়া বেলিসিয়ানা, দক্ষিণ আফ্রিকার নাগোয়া বনের এনসেফালার্টোস উডি—এমনই সব নিঃসঙ্গ গাছ, যাদের আর কোনো আত্মীয়-পরিজন বেঁচে নেই দুনিয়ায়।
কেনিয়ার দক্ষিণ ট্রান্সমারার নারোক কাউন্টির মাসাইমারা থেকে এসেছেন তরুণ আদিবাসী মাসাই প্রতিনিধি নায়েকু লেশাও।
জানালেন, তাঁদের এলাকা কিনিমতাতে একটিমাত্র প্রবীণ এনকিগা গাছ বেঁচে আছে। পবিত্র এই গাছের তলায় তাঁদের বহু ধর্মীয় ও সামাজিক কৃত্য-পার্বণ আয়োজন হয়।
২৬ বছর পর ২০২২ সালে তিনি মারা যান। তাঁর জাতিসত্তা এবং নাম কিছুই জানা যায়নি। মাটির তলায় গভীর গর্ত করে থাকতেন বলে অনেকে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘গর্তের মানুষ’। লাশ খুঁজে পাওয়ার পর দেখা যায়, তাঁর শরীরজুড়ে পাখির রঙিন পালক বিছানো ছিল।
আখ ও কফির বাণিজ্যিক আবাদের জন্য গাছপালা কেটে সব বিনাশ করা হচ্ছে। নিঃসঙ্গ এনকিগার আলাপে বাংলাদেশের মাদারীপুরের নিহত প্রবীণ বটের কথা মনে হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে আলমমীরেরকান্দি গ্রামে কুমার নদের পাড়ে ২০০ বছরের প্রবীণ গাছটিকে বাড়ি বানানোর জন্য নিষ্ঠুরভাবে খুন করা হয়।
গাছ ও প্রাণীদের মতোই বহু আদিবাসী জাতিসত্তা নিঃসঙ্গ হয়ে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যান।
আশির দশকে ব্রাজিলের আমাজন বনের রন্ডোনিয়া তানারু আদিবাসী অঞ্চলে বন দখল করে বাণিজ্যিক গবাদিখামার গড়ে তোলার জন্য বহু আদিবাসীকে হত্যা করা হয়। মাত্র একজন বেঁচে গিয়ে গভীর জঙ্গলে থাকা শুরু করেন।
২৬ বছর পর ২০২২ সালে তিনি মারা যান। তাঁর জাতিসত্তা এবং নাম কিছুই জানা যায়নি। মাটির তলায় গভীর গর্ত করে থাকতেন বলে অনেকে তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘গর্তের মানুষ’। লাশ খুঁজে পাওয়ার পর দেখা যায়, তাঁর শরীরজুড়ে পাখির রঙিন পালক বিছানো ছিল।
গাছপালা, প্রাণী বা এমনকি আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষদের তাঁদের বাস্তুতন্ত্র থেকে সরিয়ে নিলে তাঁরা বাঁচতে পারেন না। পৃথিবীর শেষ তাসমানিয়ান বাঘ থাইলাসিনকে চিড়িয়াখানায় রাখা হয়েছিল।
১৯৩৬ সালে সে মারা যায়। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বর্ণখনির জন্য বহিরাগত শ্বেতাঙ্গরা ইয়াহি আদিবাসী অঞ্চলে গণহত্যা চালায়। একজন ইয়াহি বেঁচে গিয়ে ১২ বছর পাহাড়ে কাটান।
তাঁকে পাওয়ার পর সানফ্রান্সিসকোর একটি জাদুঘরে রাখা হয়। ইয়াহি ভাষায় ‘ইশি’ মানে মানুষ, তাই নৃবিজ্ঞানীরা তাঁর নাম দেন ইশি। ১৯১৬ সালে ইশির মৃত্যুর পর ইয়াহি জাতিসত্তা তাসমানিয়ান বাঘের মতোই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
পৃথিবীর শেষ দুই নর্দার্ন হোয়াইট গন্ডার বোন এখনো বেঁচে আছে আফ্রিকায়। বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলের বমাছড়ায় যেমন খাড়িয়া ভাষা জানা দুই বোন ভেরোনিকা ও ক্রিস্টিনা কেরকেটা বেঁচে আছেন।
বান্দরবানের আলীকদমে রেংমিটচ্যুভাষী পাঁচজন আছেন এখনো। পিরিকুরা আদিবাসীদের তিনজন—মামা পাকেই, ভাগিনা তামান্ডা এবং রিতা পিরিকুরা—বেঁচে আছেন আমাজন বনে।
তাঁদের মৃত্যুর ভেতর দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে প্রজাতি, জাতিসত্তা, ভাষা এবং বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘ ইতিহাস। জাতিসংঘের ২৩টি বৈশ্বিক লক্ষ্য কি এঁদের জীবন, আবাস ও অধিকারের সুরক্ষা দিতে পারবে? এসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই মেঘলা দিনে শেষ হয়েছে ইয়েরেভান প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন।
প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনের ব্লু জোনে প্রবেশমুখেই বিখ্যাত ডাচ ডিজিটাল ও প্রতিবেশবাদী শিল্পী থাইস বিয়ারস্টেকারের নতুন শিল্প-তৎপরতা ‘ইনভ্যাসিভা’ প্রদর্শিত হয়েছে।
শিল্পীর নিজের স্টুডিও ওভেন এবং সুইজারল্যান্ডের পরিবেশ সংগঠন ভিলনার্স ইনস্টিটিউট যৌথভাবে কাজটি করেছে।
নেচার পজিটিভ প্যাভিলিয়নে ‘ইনভ্যাসিভা’ নিয়ে শিল্পী জানান, বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী প্রজাতির বিপদ রোধে এটি প্রমাণনির্ভর একটি সচেতনতামূলক শৈল্পিক তৎপরতা। কেএমজিবিএফের ৬ নম্বর লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী আগ্রাসী প্রজাতির বিস্তার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা, যা নিয়ে ইয়েরেভান সম্মেলনেও বহু তর্ক হয়েছে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই একাশিয়া ও ইউক্যালিপটাসের মতো আগ্রাসী প্রজাতি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত বনে নিষিদ্ধ করেছে।
রাশিয়ান ফেডারেশন প্যাভিলিয়নের এক আলোচনায় বিজ্ঞানী ভারোস জি পেট্রাসায়ান জানান, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৭ হাজার আগ্রাসী প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে।
বাস্তুতন্ত্র, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য আগ্রাসী প্রজাতি বড় ধরনের বিপদ ও হুমকি। বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা নদী সয়লাব হয়ে গেছে আগ্রাসী সাকার মাছে।
এমনকি বহু অ্যাকুয়ারিয়াম ফিশ ও কচ্ছপ চলে গেছে প্রাকৃতিক জলাশয়ে। আফ্রিকার বড় শামুক ফলের বাগান ও চাষাবাদে নতুন যন্ত্রণা তৈরি করছে।
আগ্রাসী প্রজাতিগুলো আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে কোনো বাস্তুতন্ত্রে আসেনি। বাণিজ্যিক ও বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমেই প্রাণবৈচিত্র্যবিনাশী এসব প্রজাতিকে জনগণের মতামত ছাড়াই দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
আজ যখন বিশ্বমঞ্চে আগ্রাসী প্রজাতির বিপদ নিয়ে কথা হচ্ছে কিংবা থাইসের মতো শিল্পীরাও তৎপর হচ্ছেন, তখন বাংলাদেশের নেত্রকোনার মেনকিফান্দা আন্দোলনের কথা মনে পড়ে।
বন বিভাগ প্রাকৃতিক শালবন কেটে একাশিয়া, ম্যাঞ্জিয়াম ও ইউক্যালিপটাসের বাগান করেছিল। গ্রামের মান্দি আদিবাসী ও বাঙালিদের নিয়ে আগ্রাসী বাগানের বিরুদ্ধে স্কুলশিক্ষক অজিত রিছিল ১৯৯২-৯৩ সালে গড়ে তোলেন ‘মেনকিফান্দা আন্দোলন’।
আগ্রাসী প্রজাতির বিরুদ্ধে পৃথিবীর প্রথম এই জন–আন্দোলনের বিজ্ঞানবার্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলনের মতো বিশাল আয়োজন করতে হচ্ছে আজ।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, স্থানীয় মানুষ বাস্তুতন্ত্রের বিজ্ঞান ও ভাষা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করতে জানেন।
আমাজনের ইকুয়েডর পাস্তাজা প্রদেশের সান্তাক্লারা গ্রাম থেকে সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন কিচুয়া আদিবাসী নেতা মিগুয়েল লাদিমির ঘ্রেফা সেরদা।
বন থেকে সংগৃহীত বীজ, পালক ও ডাল দিয়ে তৈরি কিচুয়াদের ঐতিহ্যবাহী অলংকার বিক্রির জন্য অ্যাকশন হাব এরিয়ায় বসেছেন।
লাল-কালো কুচকে কিচুয়ারা বলেন পিওনিয়া মুইয়ি এবং কাওয়াঝিঙ্গিকে সানপেদ্রো মুইয়ি। এসব বীজদানা দিয়ে তাঁরা অলংকার তৈরি করেন।
সেরদা জানান, কিচুয়াদের কাছে বন পবিত্র জীবন্ত সত্তা। বন থেকে বীজ বা কোনো উপাদান সংগ্রহের আগে বহু প্রথাগত নিয়ম মানতে হয়।
বনে প্রবেশের আগের দিন ভোরে গুয়েউসা চা পান করে স্বপ্নে আদেশ পাওয়ার জন্য বনের আত্মা চাকরা আমুর কাছে প্রার্থনা করা হয়।
কোন এলাকা থেকে কীভাবে সংগ্রহ করলে বনের ও মানুষের ক্ষতি হবে না, সেসব বার্তা স্বপ্নে পাওয়া যায়। বনে প্রবেশের দিন নারীরা মান্ডুরুগাছের রস দিয়ে মুখে উলকি আঁকেন।
সংগ্রহের পর প্রতিটি উপাদানকে শুদ্ধ করেন গ্রামের ইয়াচাক (শামান)। পিওনিয়া খুব বিষাক্ত হয় এবং কেবল ঝরে পড়া বীজদানাই সংগ্রহ করা হয়। বাকি বীজ বংশবিস্তারের জন্য রেখে দেওয়া হয়।
আলাপকালে পাশে এসে দাঁড়ান বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি থেকে আসা ত্রিপুরা আদিবাসী নেতা মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা।
কিচুয়াদের মালাগুলো হাতে নিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যান। জানান, ত্রিপুরারাও এসব বীজ ব্যবহার করে মালা তৈরি করেন।
কুচকে ত্রিপুরারা বলে তাইক্রা এবং কাওয়াঝিঙ্গিকে মাইগ্রা। ত্রিপুরারা মাইলুংমা ও খুলুংমা দেবীর কাছে প্রাণসম্পদ সংগ্রহের জন্য স্বপ্নে আদেশ চান। বনের পবিত্র শক্তি লাম্রার পূজা করেন।
ত্রিপুরাদের ওচাই (শামান) শুদ্ধিকরণ ও পূজার কাজগুলো করেন। উভয়েই জানালেন, বন বিনাশ, ভূমি দখল, দূষণ, অন্যায্য উন্নয়ন ও জলবায়ু সংকটের কারণে প্রাকৃতিক সম্পদ কমছে এবং প্রবেশাধিকার সংকুচিত হচ্ছে।
প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন উপলক্ষে ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিং গ্রুপ ফর ইনডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স’ এবং ‘ইনডিজেনাস ডিবেট’ ডেনমার্ক থেকে ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্টস, বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইনডিজেনাস পিপলস রাইটস’ শীর্ষক একটি প্রমাণভিত্তিক বই প্রকাশ করেছে।
ইন্দোনেশিয়া, বলিভিয়া, মিয়ানমার, গায়ানা, ক্যামেরুন ও ইকুয়েডরের উদাহরণ দিয়ে বইটি জানায়, বহুজাতিক খনন, বাণিজ্যিক প্রকল্প, আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক কাঠামো ও মিথ্যা জলবায়ু সমাধান প্রাণবৈচিত্র্য বিনাশ এবং আদিবাসীদের প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর জীবনের অধিকার লুট করছে।
বিশ্বের নানা বাস্তুতন্ত্রে প্রাণবৈচিত্র্যকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে নানা সাংস্কৃতিক বৈভব ও ভৌগোলিক মহিমা।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন পাজেরিক কার্পেট যেমন আর্মেনিয়ার স্বতন্ত্র ভৌগোলিক মহিমা।
ভার্নিসাজ মার্কেটের এক দোকানের কার্পেট দেখিয়ে ইয়েরেভানের শিল্পী তিরায়ের ডারবিনায়ান জানান, এর প্রধান মোটিফ বা নকশাটি এসেছে স্থানীয় মারেল জাতের এক হরিণ প্রজাতি থেকে।
আছে জীবনবৃক্ষ, পাখি, ড্রাগন ও ফুল। বাংলাদেশের নকশিকাঁথার মোটিফ যেমন চালতা ফুল, পাখি ও নানা জাতের মাছ।
ব্লু জোনের তাতেভ, স্পিটাক, ভায়াক ও জাসকানস নামের সভাকক্ষ ও প্যাভিলিয়ন এবং গ্রিন জোনে আয়োজিত সংলাপগুলোতে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকজ্ঞান ও অধিকার সুরক্ষা এবং প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে।
জাম্বিয়ার মুসুন্ডা কাপেনা, গ্রিসের ক্রিস্টিনা আলমজিদ্যু, সোমালিয়ার আহমেদ শেখ আবদিরাহাম আবদুল্লাহ, কেনিয়ার মেরি ইরুংগু, ভারতের দীপায়ন দে, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার রুথ স্পেন্সার, ইতালির অলিভার অলিভেরোস, ব্রাজিলের ম্যাথিউস অ্যালভেস জানেলা, ফিলিপাইনের লাউরো গুইলারন দিয়েগো, বাংলাদেশের ফরিদা আখতার, ফ্রান্সের শার্লট হডিন কিংবা সেনেগালের মামে মাইমুনা দিয়েনে তাঁদের আলোচনায় প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষার সব স্থানীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কাঠামোতে স্থানীয় জনগণ ও জ্ঞানপ্রক্রিয়াকে যুক্ত করার জোর দাবি জানান।
‘বাসেল, রটারডাম ও স্টকহোম কনভেনশনের’ প্রধান নির্বাহী রলফ পায়েট কিংবা ‘কৃষক ও গ্রামীণ জনগণের জন্য ওয়ার্কিং গ্রুপের’ ডাভিট হাকোবায়ানের মতো জাতিসংঘের বহু প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, অধিকারকর্মী, পেশাজীবী, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক ও বহু সংগঠন ইয়েরেভান সম্মেলনে প্রকৃতির প্রতি মায়াময় দায়িত্ব এবং লোকায়ত ব্যবস্থাপনার সুরক্ষা, স্বীকৃতি ও অধিকার নিয়ে আলাপ করেন।
বৃষ্টিতে ভিজে শেষ হওয়া ইয়েরেভান প্রাণবৈচিত্র্য সম্মেলন আমাদের আবারও জানিয়ে দেয়, প্রকৃতির মায়া আর লোকজ্ঞানের কাছেই ফিরছে পৃথিবী।
আর্মেনিয়া ন্যাশনাল গ্যালারিতে নাজারেত কারোয়ানের কিউরেশনে চলছে প্রদর্শনী ‘হোয়েন রিভার স্পিক’। কাবেরি, আরাকস, রাইন ও মিসিসিপি নদীর আওয়াজ বাজছে সারাক্ষণ।
পৃথিবীর প্রতিটি নদী, প্রাণসত্তা, বাস্তুতন্ত্র ও সংস্কৃতি অবিরত কথা বলছে। যুদ্ধ, সহিংসতা, ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার ও বহুজাতিক বাণিজ্যিক বাহাদুরি ঠেলে এই নব্য–উদারবাদী ব্যবস্থা কি প্রাণপ্রকৃতির কথা শোনার জন্য আরেকটি সম্মেলনের অপেক্ষা করবে?
পাভেল পার্থ লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী *মতামত লেখকের নিজস্ব