পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই পরিচালিত কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন টুপটুপ রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার সকালে কাঠের অবকাঠামোয় নির্মিত এই রিসোর্টে লাগা আগুনে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, যথাযথ ছাড়পত্র ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালনা করায় গত এপ্রিলে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য নোটিশ প্রদান করেছিল। তবে সেই নির্দেশনা অমান্য করায় প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্ট চালানোর অভিযোগে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে বিভিন্ন সময়ে আরও ২৬টি রিসোর্ট এবং ১০টি রেস্টুরেন্টকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি রিসোর্ট নোটিশ অমান্য করায় তাদের জরিমানা করা হয় এবং দুটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বাকি ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, ১৯৯৯ সালে সরকার মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন সৈকত এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছিল। টুপটুপসহ আরও অনেক রিসোর্ট এই সংরক্ষিত ইসিএ এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, এসব অবৈধ রিসোর্ট বন্ধ করার উদ্যোগ নিলে তাদের প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার অঞ্চলের পরিচালক জমির উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে জানান, “ছাড়পত্র গ্রহণ না করে কার্যক্রম পরিচালনা করায় এপ্রিলে টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। নোটিশ না মানায় পরের মাসের ১৩ তারিখ তাদের এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।”
তিনি আরও জানান, কোনো রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট বা হোটেল-মোটেলকে ছাড়পত্র পেতে হলে প্রথমেই কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভবনের নকশার অনুমোদন নিতে হয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট থাকা বাধ্যতামূলক। টুপটুপ রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই দুইটির কোনোটিই ছিল না।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কলাতলী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে আরও ১৪৫টি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিনি মাত্র চার মাস আগে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার আগে টুপটুপ রেস্টুরেন্টকে রিসোর্টটি ভেঙে ফেলার জন্য দুই দফায় নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, কারণ এই রিসোর্টের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে থাকা তালিকা অনুযায়ী মেরিন ড্রাইভে দোকানপাটসহ ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট আছে। আমরা আগামী সপ্তাহ থেকে এগুলোর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করব।”
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ইসিএ এলাকায় নির্মিত এসব রিসোর্টকে বিভিন্ন সময়ে জরিমানা করা হলেও তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। পরিবেশ আইনের আওতায় কেবল জরিমানা বা নোটিশ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও উচ্ছেদ বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার আইনি ক্ষমতা নেই। এই উচ্ছেদ বা বন্ধ করার আইনি এখতিয়ার রয়েছে কেবল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হাতে।
জরিমানা করা ১৪টি রিসোর্টের মধ্যে রামু এলাকার সাম্পান বিচ রিসোর্টকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, নিসর্গ হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টকে চার লাখ টাকা, উখিয়ার সি পার্লস বীচ রিসোর্টকে এক লাখ টাকা, টেকনাফের জাহাজপুরা ক্যাসলকে এক লাখ এক হাজার টাকা, উখিয়ার সি পার্ল বীচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পাকে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, কলাতলীর জিডি সমুদ্র বিলাসকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মায়াবী বীচ রিসোর্টকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং টাইটান হোটেলকে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এছাড়া কলাতলী এলাকার হোটেল জানা ডাডাকে দুই লাখ টাকা এবং হোটেল স্যুট সাদাফকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। নোটিশপ্রাপ্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে হিমছড়ি এলাকার বে হিল, বে ফ্রেন্ডস রিসোর্ট, সাম্পান রিসোর্ট, মারমেইড ক্যাফে, আরনিম রিসোর্ট, ছুটি রিসোর্ট, হোটেল ইনানী লং বে এবং ওশান পার্ল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। পাশাপাশি নামহীন তিনটি নির্মাণাধীন হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং একটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।