স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গত বুধবার কক্সবাজারে ভ্রমণে গিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন ওরফে মাসুদ (৩০)। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁরা ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতের নিকটবর্তী টুপটুপ রিসোর্টে অবস্থান নিতে শুরু করেন। পরিকল্পনা ছিল, দুই দিন পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখার পর শনিবার সকাল ১০টার বাসে তাঁরা ঢাকায় ফিরবেন। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার আগেই রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যাতে ইসমাইলের চার ভাগনি, এক ভাগনে এবং এক নাতি প্রাণ হারান।
ভয়াবহ সেই আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচতে জানালা দিয়ে লাফিয়ে কোনোমতে প্রাণে বেঁচে যান ইসমাইল ও তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেছা। তবে এই জীবনযুদ্ধের সময় মেহেরুনের শরীরের কিছু অংশ পুড়ে যায়। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিজের চোখের সামনে প্রিয় ছয়জন স্বজনের মৃত্যু এবং স্ত্রীর দগ্ধ হওয়ার দৃশ্য ইসমাইল হোসেনকে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে। এই চরম শোক ও আতঙ্কের স্মৃতি তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, যার ফলে তাঁর ‘ট্রমা’ কাটছে না। তিনি বর্তমানে মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে, কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলছেন না।
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। চাকরির কারণে তিনি স্ত্রী মেহেরুন নেছাকে নিয়ে ঢাকার দক্ষিণখান এলাকায় বসবাস করতেন। রিসোর্টের এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে ইসমাইলের ভাগনি লায়লা জাহান নাবিলা, ইসরাত জাহান মালিহা, ফারিয়া কবির ও মিলিতা মেহজাবীন; ভাগনে নাফিজ তেহামী এবং নাতি (ফারিয়া কবিরের শিশুপুত্র) ফাইজান নুর মৃত্যুবরণ করেন।
ইসমাইল হোসেনের আরেক ভাগনে মো. আহাদ সরকার মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রিসোর্ট থেকে বের হতে না পেরে মামার চোখের সামনে ছয়জন আত্মীয় একসঙ্গে পুড়ে মারা গেছেন। জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচে যান মামা ও মামি। নামতে গিয়ে মামির বাঁ পা ও ডান হাত কেটে যায়। পায়ের কিছু অংশ পুড়ে যায়। মামি এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।”
আহাদ সরকার আরও জানান, একসঙ্গে চার ভাগনি, এক ভাগনে ও এক নাতির করুণ মৃত্যু চোখের সামনে দেখে তাঁর মামা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। রিসোর্টের আগুন এবং স্বজন হারানোর ভয়াবহতা তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি বলেন, “চোখের সামনে একসঙ্গে চার ভাগনি, এক ভাগনে ও এক নাতিকে পুড়ে মারা যেতে দেখে মামা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। দুশ্চিন্তা, রিসোর্টে আগুন, একসঙ্গে ছয় স্বজনের মৃত্যুর ভয়াবহতা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কোনোভাবেই মামার ‘ট্রমা’ কাটছে না। তিনি ঠিকমতো খাচ্ছেন না। কারও সঙ্গে কথাও বলছেন না।”
নিজের শোক প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, “মারা যাওয়া ছয়জন আমার খালাতো ভাইবোন ও ভাগনে। তাঁদের এই মৃত্যু মানতে পারছি না। স্বজন হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণায় আছি।”
গত শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক সংলগ্ন ওই রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরবর্তীতে স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মোট ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।