‘ফোন করে বলছিল, বাবা সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলছে। ঘোরাঘুরি শেষে ঢাকায় ফিরব। বাবা, তুমিও ঢাকায় চলে এসো। কিন্তু কোথা থেকে কী হয়ে গেল! আমার ছেলে নাহিদ, বউমা আর তাদের দুই মেয়ে—কেউই এখন আমার কাছে নেই।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসছিল যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের বাসিন্দা মতিয়ার রহমানের। যে ছেলের সঙ্গে খুব শীঘ্রই পুনরায় দেখা হওয়ার কথা ছিল, সেই ছেলেই এখন নিখোঁজ। একই সঙ্গে নিখোঁজ হয়ে আছেন তার পুত্রবধূ এবং আদরের দুই নাতনিও।
কক্সবাজারের ইনানী এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর থেকে তাদের কোনো সন্ধান পাচ্ছেন না মতিয়ার রহমান। চরম অনিশ্চয়তা এবং গভীর আশঙ্কায় কাটছে তার প্রতিটি মুহূর্ত।
নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা হলেন মতিয়ার রহমানের ছোট ছেলে নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাদের দুই শিশুসন্তান রুজাইনা ইনায়া (৮) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
নিজের আকুতি প্রকাশ করে মতিয়ার রহমান বলেন, ‘আমি দেড় মাস আগে গ্রামে এসেছি। বুধবার আবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। ছোট ছেলে নাহিদের কাছেই থাকি। শুক্রবার রাতেও ওর সঙ্গে কথা হয়েছে। ওরা সবাই মিলে বিচে আনন্দ করছিল, বাচ্চারা খেলছিল। ছেলে আমাকে ঢাকায় যেতে বলেছিল। কিন্তু এখন আমার ছেলে কোথায়, বউমা কোথায়, নাতনি দুটো কোথায়—কিছুই জানি না। ওর সঙ্গে আর কথা হবে না, এটা ভাবতেই পারছি না।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নাহিদুর রহমান দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছিলেন। তিনি রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত গ্র্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে মিরপুর এলাকায় বসবাস করতেন নাহিদুর।
নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, নাহিদুর ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে একটি কক্ষ বুকিং দিয়েছিলেন। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাদের রিসোর্ট ত্যাগ করার কথা ছিল। শুক্রবার তারা কক্সবাজার যাওয়ার কথা পরিবারকে জানিয়েছিল। তবে শনিবার রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকে নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তার এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ঘটনার পর থেকে তাদের খোঁজ নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করা হলেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এই বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) ফিরোজ কবির জানান, ১০টি মরদেহের দাবিদার হিসেবে ইতিমধ্যে একাধিক পরিবার সামনে এসেছে। আগুনে মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এই কারণে দাবিদার পরিবারগুলোর সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের জানা মতে কেউ নিখোঁজ নেই। তবে মরদেহগুলো পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। উদ্ধার অভিযান গতকাল বিকেলেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। সর্বশেষ যে চারজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দুটি শিশু ছিল।
উল্লেখ্য, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টের কোনো অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুন মাসে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল। শনিবার (১৮ অক্টোবর) অগ্নিকাণ্ডের দিন রিসোর্টের ৬টি রুমে মোট ১৬ জন পর্যটক অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে ৫ থেকে ৬ জন সকালে বাইরে ছিলেন।