কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত কাঠের তৈরি টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার ১০ দিন পর আরও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা যৌথভাবে তল্লাশি চালিয়ে রিসোর্টের দ্বিতীয় তলার কার্নিশে এই মরদেহটি খুঁজে পান। পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ হওয়া পর্যটক নাসরিন আক্তারেরই এই মরদেহ।
অন্যদিকে, এই অগ্নিকাণ্ডে আগে উদ্ধার হওয়া ১০ জন পর্যটকের মরদেহ আজ বেলা তিনটার দিকে তাঁদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়। এই সময়ে স্বজনদের তীব্র আহাজারিতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ ভারী হয়ে ওঠে।
১০ দিন পর লাশ উদ্ধার
পুলিশ জানিয়েছে, ১০ দিন পর উদ্ধার হওয়া এই মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে। উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, “অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ থাকা নাসরিন আক্তার নামের এক নারীকে খুঁজতে গিয়ে আজ আবার টুপটুপ রিসোর্টে তল্লাশি চালানো হয়েছে। এ সময় আগুনে পুড়ে কঙ্কালসার একটি মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। এটি নিখোঁজ নাসরিন আক্তারের কি না, তা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
জানা গেছে, নিখোঁজ নাসরিন সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তিনি দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাঁর স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি।
পরিচয় শনাক্ত হওয়া ১০ মরদেহ হস্তান্তর
টুপটুপ রিসোর্ট থেকে উদ্ধার হওয়া প্রথম ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। নমুনা সংগ্রহের পর তা ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ল্যাবে পাঠানো হয়। সিআইডি ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। এরপর আজ বেলা তিনটার দিকে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মরদেহ হস্তান্তরের সময় স্বজনরা নিহতদের স্মৃতিচারণা করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও উখিয়া থানার উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ জানান, শনাক্ত হওয়া ১০ জনের মধ্যে একটি পরিবারের ছয়জন এবং অন্য একটি পরিবারের চারজন সদস্য রয়েছেন। দুটি পরিবারই ঢাকায় বসবাস করতেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ছয়জনের মধ্যে রয়েছেন মৌলিতা মেহজাবিন (১৯), লায়লা জাহান (২৫), ইসরাত জাহান (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), তাঁর ছয় বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁরা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় থাকতেন।
ঢাকার খিলগাঁও মুগদা এলাকার আমিনুল ইসলাম খান নিহতদের লাশ গ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে চারজন তাঁর ভাগনি, একজন ভাগনে এবং একজন নাতি। বিকেলে আমিনুল ইসলাম খান বলেন, “আমাদের পরিবারের ছয়জন এবং যশোরের আরেক পরিবারের চারজনের মরদেহ বুঝিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। আমরা মরদেহ নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “স্বজনদের মরদেহ পেলাম ১০ দিন পর। আমরা চাই, এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক। যাদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হোক।”
অন্য পরিবারের নিহত চারজন হলেন ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)। নাহিদুর রহমানের বড় ভাই যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের জাহিদুর রহমান তাঁদের লাশ গ্রহণ করেন।
লাশ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জেলা প্রশাসক জানান, নতুন করে উদ্ধার হওয়া মরদেহটিরও দ্রুত পরিচয় শনাক্ত করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, রিসোর্টের মামলা নিয়ে তদন্ত চলছে। আসামিদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার ধারায় (জামিনযোগ্য) কোনো পুলিশ কর্মকর্তার গাফিলতি পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।