কক্সবাজারের পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে নিখোঁজদের তালিকায় ১১ জনের নাম থাকলেও এখনো একজন ব্যক্তির খোঁজ মেলেনি। নিখোঁজ ওই ব্যক্তির সন্ধানে রিসোর্ট এলাকায় পুনরায় তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

গত শনিবার সকালে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি এই টুপটুপ রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত হয়। সোমবার বিকেল পর্যন্ত উদ্ধার করা মরদেহগুলোর কোনো পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কক্সবাজারে ছুটে এসেছেন অনেক মানুষ। তাঁরা হাসপাতালের মর্গ এবং পুড়ে যাওয়া রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপের মাঝে স্বজনদের খুঁজছেন। তবে আগুনের তীব্রতায় মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে, চেহারা দেখে কাউকে চেনার কোনো উপায় নেই। স্বজনরা হাত, গলা কিংবা পায়ে থাকা অলংকার দেখে পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফল মেলেনি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, “বিভিন্ন গণমাধ্যমে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে নিহত ব্যক্তিদের কয়েকটি পরিবারের ছবি ও পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। তবে ১০টি মরদেহের প্রকৃত পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় মরদেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। কক্সবাজারে এ পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। পরীক্ষার পর পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ জন্য কিছুদিন সময় লাগবে।”

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন) লে. কর্নেল আজাদ আনোয়ার জানান, টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন থাকলেও ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে গতকাল নতুন করে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি।”

নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, “নিখোঁজ একজন অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশন ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।”

পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্বজনদের দেওয়া তথ্যানুসারে, নিহত ১০ জনের মধ্যে ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ রয়েছেন। বাকিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রাণহানির পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁদের পরিচয় পাওয়া গেছে—মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার বিকেলে তাঁদের মধ্যে চারজনকে বিমানে ঢাকায় পাঠানো হয়।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, বর্তমানে হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে আহত কোনো রোগী ভর্তি নেই। তিনি বলেন, “স্বজনদের খোঁজে অনেকে হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় নারী, পুরুষ কিংবা শিশু হিসেবে আলাদা করাও কঠিন। গতকাল সন্ধ্যায় সিআইডির সদস্যরা মর্গের হিমঘরে রাখা মরদেহগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। পরীক্ষার জন্য সেগুলো ঢাকায় পাঠানো হবে।”

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। ডিএনএ পরীক্ষার ফল পেতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে।