কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মরদেহগুলো বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আজ রোববার সকাল থেকেই প্রিয়জনের মরদেহ বুঝে নিতে হাসপাতালের মর্গ এলাকায় ভিড় করেছেন স্বজনরা। তবে মরদেহের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় তাঁদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর শোকের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
হাসপাতাল প্রাঙ্গণে স্বজনদের আহাজারির শব্দে শোকের পাশাপাশি ফুটে উঠেছে তীব্র ক্ষোভ। তাঁদের দাবি, এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনায় কেবল শোক প্রকাশ করলেই হবে না, বরং এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ হস্তান্তর করার পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
আজ রোববার বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কথা বলা হয়। বেলা দুইটা পর্যন্ত তাঁদের কেউই মরদেহ বুঝে পাননি। উল্লেখ্য, গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় মরদেহগুলো হিমঘরে রাখা হয়েছিল।
এই অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে হারিয়েছেন দেওয়ান ফয়সাল। উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের মধ্যে তাঁর স্ত্রীর মরদেহ থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এই আশাতেই কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে এসে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। আজ সকালে হাসপাতালের করিডোরে কথা বলার সময় দেওয়ান ফয়সাল বলেন, ‘আমি জানি, আমার স্ত্রী নাসরিন আক্তার মুক্তাকে আর ফিরে পাব না। কিন্তু আমি চাই না, আর কোনো স্বামীকে এভাবে তাঁর স্ত্রী হারাতে হোক, আর কোনো পরিবারকে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে হাসপাতালে ছুটতে হোক।’
দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা (উত্তর) ছাত্রদলের সহসভাপতি এবং স্ত্রীসহ ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় বসবাস করতেন। ঘটনার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া কোনো রিসোর্ট পরিচালিত হলে এবং কর্তৃপক্ষের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে তার দায় কার? তিনি আরও বলেন, যাঁদের দায়িত্ব ছিল তদারকি করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আইন প্রয়োগ করা, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে বিচার চেয়ে ফয়সাল বলেন, ‘আমাদের স্বজনদের ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই, কিন্তু বিচার নিশ্চিত করার ক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে। আমার স্ত্রীকে ফিরে পাব না, কিন্তু তাঁর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিবারের মৃত্যুফাঁদ হয়ে না থাকে। আমরা শুধু শোক প্রকাশ নয়, জবাবদিহি চাই, বিচার চাই।’
অন্যদিকে, এই অগ্নিকাণ্ডে বড় ভাই, ভাবি ও তাঁদের দুই শিশুসন্তানকে হারিয়েছেন নঈমুদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, রিসোর্টে যদি পর্যাপ্ত বহির্গমন পথ এবং যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা থাকত, তবে হয়তো এত প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। নঈমুদ্দিন বলেন, ‘আমার বড় ভাই, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের দুই সন্তান—সবাইকে হারিয়েছি। এই শোক ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমরা পুরো পরিবার ভীষণ মর্মাহত।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আগুন লাগার পর ভবন থেকে বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ থাকলে মানুষ নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ পেত। ভবন নির্মাণে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় এটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং আগুন কীভাবে এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে, সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বন্ধুর খোঁজে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ছুটে এসেছেন জুয়েল রানা। অগ্নিকাণ্ডে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নাহিদুর রহমানকে হারিয়েছেন। আজ সকালে জুয়েল রানা বলেন, ‘আমি নাহিদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। নাহিদ আমার খুব কাছের বন্ধু ছিল, আমার কলিজার টুকরা ছিল সে। ওকে হারানোর কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’ তিনি দাবি জানান, এই ঘটনায় কেউ দায়ী থাকলে তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে যাঁদের অবহেলা ছিল, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় এনে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে।
মরদেহগুলো দেখে নিশ্চিতভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, মরদেহগুলো থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ডিএনএ পরীক্ষাগারে পাঠানো হবে। পাশাপাশি নিহতদের বাবা-মা, ভাই-বোন কিংবা সন্তানের মতো নিকটাত্মীয়দের থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হবে। দুই পক্ষের নমুনা পরীক্ষার ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল আরও জানান, ডিএনও পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ এবং ফল মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ কাজে তিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে পরীক্ষার কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ডিএনএ পরীক্ষার নিজস্ব পরীক্ষাগার নেই। হাসপাতালের দায়িত্ব হলো মরদেহ থেকে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা। এরপর ডিএনএ পরীক্ষা ও পরিচয় শনাক্তের পরবর্তী কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে।