কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় অবস্থিত ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে এই ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ঢাকার দুটি পরিবারের সদস্য রয়েছেন। তবে নিখোঁজদের তালিকায় থাকা স্কুলশিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া কোনো মরদেহের মিল পাওয়া যায়নি। ফলে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের বাইরে মুক্তার পরিণতি কী, তা নিয়ে রহস্য ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মরদেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে স্বজনদের নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

নিহতদের মধ্যে একটি পরিবারের চার সদস্যের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তার স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)।

অন্য পরিবারের ছয় সদস্যের মধ্যে রয়েছেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), তার কাজিন লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭) ও ফারিয়া কবির (৩৩)। এছাড়া ফারিয়ার ছয় বছর বয়সি ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর এবং ফারিয়ার ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪) also প্রাণ হারিয়েছেন। তারা ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন।

জানা গেছে, নাফিস তেহামি ‘জেরিফ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। মৌলিতা মেহজাবিন আলভি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে পপুলেশন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ সায়েন্সেস বিষয়ে পড়াশোনা করতেন এবং লায়লা জাহান নাবিলা ছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

মুক্তার ডিএনএ মেলেনি, স্বামীর দাবি কক্ষে আটকা পড়েছিলেন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৭) ডিএনএ নমুনার সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের কোনো নমুনার মিল পাওয়া যায়নি।

মুক্তা সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষিকা। দুই বান্ধবীর সঙ্গে ছুটি কাটাতে তিনি কক্সবাজারে গিয়েছিলেন। তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা জেলা শাখার সাবেক নেতা।

মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সালের দাবি, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত রিসোর্টে তার স্ত্রীসহ তিন বান্ধবী উঠেছিলেন। আগুন লাগার আগে তার স্ত্রীর দুই বান্ধবী কক্ষ থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। তবে মুক্তা তখন কক্ষে থাকায় ভেতরে আটকা পড়েন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

ফয়সাল বলেন, “সোমবার তিনি পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার কাছে গেলেও বিষয়টি নিয়ে কেউ স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। পরে তিনি সন্ধ্যায় তার দুই স্বজন নিয়ে আবারো ঘটনাস্থলে যান।”

এর আগে তদন্ত কমিটির প্রধান কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান জানিয়েছিলেন, নিখোঁজ মুক্তার অবস্থান শনাক্ত করতে তার মোবাইল ফোন নম্বরের তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারও কাছ থেকে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট থেকে ১০টি মরদেহ উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজের তালিকায় ১১ জনের নাম থাকায় উদ্ধার হওয়া মরদেহ ও নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যার মধ্যে গরমিল দেখা দেয়। মুক্তার ডিএনএ না মেলায় সেই অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

গত ১৭ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত তিনতলা টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। কক্সবাজার শহর থেকে রিসোর্টটির দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। আগুন লাগার সময় রিসোর্টের প্রথম ও দ্বিতীয় তলার আটটি কক্ষে পর্যটকেরা অবস্থান করছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও কর্মীদের থাকার জায়গা।

ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। এ কাজে ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেন বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা। শেষ পর্যন্ত রিসোর্ট থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আহত সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও উদ্ধার কাজের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানান, বিকট বিস্ফোরণের শব্দের পর রিসোর্টটিতে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েকজন পর্যটককে বের হয়ে আসতে দেখা যায়। এরপর রিসোর্টের অন্তত পাঁচজন কর্মীকে দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যেতে দেখেন তারা।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহানকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি।

এ ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক মোহাম্মদ তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক। রিসোর্টের আরেক মালিক নেওয়াজ মোর্শেদও আত্মগোপনে রয়েছেন।