কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট থেকে বলে ধারণা করছে পুলিশ ও তদন্ত কমিটি। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকায় আগুন অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

গত ১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন মেরিন ড্রাইভের পাশে অবস্থিত তিনতলা এই রিসোর্টটিতে আগুন ধরে যায়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ১০ জন পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এই রিসোর্টটির দোতলা ও তিনতলার আটটি কক্ষে পর্যটকেরা অবস্থান করছিলেন। নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ এবং কর্মীদের থাকার জায়গা।

আগুনের সময় রিসোর্টে কতজন উপস্থিত ছিলেন, তা নিয়ে স্বজনদের দাবি এবং পুলিশের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে। স্বজনদের ভাষ্যমতে, ১৬ অক্টোবর শুক্রবার রাতে নারী ও শিশুসহ মোট ২১ জন পর্যটক সেখানে অবস্থান করছিলেন। শনিবার ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান সৈকতে বেড়াতে গেলে রিসোর্টে ১৯ জন পর্যটক অবশিষ্ট ছিলেন।

ঘটনার পর থেকে রিসোর্টের মালিক এবং মামলার প্রধান আসামি মো. তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তার দাবি, তানভীর বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। রিসোর্টের অপর মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ আরও কয়েকজন আত্মগোপনে আছেন। এখন পর্যন্ত কেবল সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ তাঁকে ৭ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানালেও এখনো রিমান্ড শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।

আগুনের সূত্রপাত যেভাবে

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসাবাদ ও এ পর্যন্ত অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট হয়। সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে।”

ওসির ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ছিল। এর পাশাপাশি তীব্র বাতাস এবং কাঠের অবকাঠামো থাকার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে গুদামে ঠিক কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন ঘোষ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য আসছে। প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনে আরও সময় লাগবে।”

ঘটনার পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির এক সদস্য জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগা এবং পরবর্তীতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। বিস্তারিত তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হবে বলে তিনি জানান।

রিসোর্টের পাশে চা-কফির দোকান চালানো গিয়াস উদ্দিন জানান, ঘটনার সকালে বিকট শব্দ শুনে তিনি বাইরে এসে রিসোর্টে আগুন দেখতে পান। তখন লোকজন ছোটাছুটি করছিলেন। আগুনের তাপে তাঁর দোকানের একটি ফ্রিজ ও কাঠের কিছু অংশ পুড়ে যায়। জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজও বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন, তবে শব্দের উৎস সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত নন।

প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত এই রিসোর্টটির কক্ষের মেঝে, দেয়াল এবং সিঁড়ির বড় অংশই ছিল কাঠের তৈরি। সড়কের দিকে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশ তৈরি করা হয়েছিল, যা আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

শুধু ট্রেড লাইসেন্সেই ব্যবসা

জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টটি কেবল জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্সের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছিল। গত ২২ জুলাই তানভীর সুলতান মিয়ার নামে এই লাইসেন্সটি দেওয়া হয়, যেখানে তাঁর ঠিকানা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া উল্লেখ করা হয়েছে।

লাইসেন্সটির মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। লাইসেন্স ফি ৫০০ টাকা, মূল্য সংযোজন কর ৭৫ টাকা এবং বাণিজ্যিক কর ১ হাজার ৪২৫ টাকা মিলিয়ে মোট দুই হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “ইউনিয়ন এলাকায় ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ফি নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়। টুপটুপের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।” তবে তিনি আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের পর জানা গেছে যে প্রতিষ্ঠানটির ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমোদন ছিল না।

১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস পুনরায় তল্লাশি চালালেও কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, “১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস আবার তল্লাশি চালালেও কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।”

অতিথি ও আহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য

আগুনের সময় রিসোর্টে কতজন ছিলেন, তা নিয়ে স্বজন ও পুলিশের হিসাবে গরমিল রয়েছে। স্বজনদের দাবি অনুযায়ী, ২১ জন পর্যটকের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। এই হিসাবে আরও একজনের সন্ধান মেলেনি বলে তাঁদের দাবি।

অন্যদিকে, ওসি আতিকুর রহমান জানান, প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেপ্তার সহকারী ব্যবস্থাপকের তথ্য অনুযায়ী, আগুনের সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সাতজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে কেউ নিখোঁজ থাকার তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি এবং এ বিষয়ে কোনো লিখিত দাবিও আসেনি।

পোড়া রিসোর্টের সামনে পর্যটকদের ভিড়

গত বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে দেখা যায়, মেরিন ড্রাইভে চলাচলকারী পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে পোড়া রিসোর্টটি দেখছেন। কেউ ছবি ও ভিডিও তুলছেন, আবার কেউ পাশের দোকানে বসে দুর্ঘটনার কারণ এবং মালিকের পলাতক থাকা নিয়ে আলোচনা করছেন।

ঢাকার উত্তরার ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমদ ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ঘটনার দিন মুঠোফোনে আগুনের ভিডিও দেখেছিলেন তিনি। রিসোর্টের সামনে এক নারীর আর্তনাদ তাঁর মনে দাগ কেটেছে। এমন প্রাণহানি ঠেকাতে অবৈধ রিসোর্ট বন্ধ এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।”

চট্টগ্রামের রাউজানের ব্যবসায়ী গফুর উদ্দিন বলেন, মেরিন ড্রাইভে একের পর এক রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো কক্ষ ও খাবারের বিজ্ঞাপন দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা হলেও দুর্ঘটনার পর দায়িত্ব নেওয়ার কেউ থাকে না। তোফায়েল আহমদের প্রশ্ন, “এতগুলো প্রাণ যে গেল, তার দায়িত্ব কে নেবে?”