দ্বিধা, অস্বস্তি এবং প্রস্তুতির চরম ঘাটতি—মিরপুর টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে বাংলাদেশের পরাজয়ের কারণ খুঁজতে গেলে বারবার এই বিষয়গুলোই সামনে চলে আসে। তবে এই অসন্তোষগুলো ম্যাচ শুরুর আগেই দানা বেঁধেছিল। চার দিনের লড়াইয়ে সেই অসংগতিগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি টিম ম্যানেজমেন্ট এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিকল্পনার মারাত্মক ত্রুটিও এখানে দৃশ্যমান।
গত এক বছর ধরে টেস্ট ক্রিকেটে উন্নতির একটি নির্দিষ্ট পথ খুঁজে পেয়েছিল বাংলাদেশ। স্পোর্টিং উইকেটে খেলে স্কোরবোর্ডে লড়াই করার মতো রান তোলা এবং এরপর বাকি কাজটা পেসারদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া—এটাই ছিল মূল পরিকল্পনা। স্পিনাররা যে এই প্রক্রিয়ায় কোনো ভূমিকা রাখেননি, তা নয়। তবে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের প্রধান শক্তির জায়গা হয়ে উঠেছিল পেস বোলিং।
বল হাতে তো বটেই, ব্যাট হাতেও প্রতিপক্ষের পেসারদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা তুলনামূলক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। পরিসংখ্যান বলছে, মিরপুরে গত পাঁচ বছরে স্পিনারদের বলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা আউট হয়েছেন ৮০ বার, যেখানে পেসারদের বলে আউট হয়েছেন ৭৩ বার। যদিও এই ব্যবধান খুব বেশি নয়, তবে স্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের দুর্বলতা মিরপুর টেস্টে আবারও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
দুই ইনিংসে বাংলাদেশের ২০টি উইকেটের মধ্যে ১৬টিই নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা। স্পিনের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানদের এই অস্বস্তির চিত্র অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের কথাতেও উঠে এসেছে। ব্যাটসম্যানরা স্পিন ভালো খেলেন নাকি পেস—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “কখনো স্পিন ভালো খেলে, কখনো আবার পেস।”
তাহলে কোন ভরসায় মিরপুরে স্পিনসহায়ক উইকেট প্রস্তুত করা হলো? এই প্রশ্নটিই বারবার করা হয়েছে টেস্ট অধিনায়ক নাজমুলের কাছে। উত্তরে তিনি প্রায় প্রতিবারই একই কথা বলেছেন যে, প্রতিপক্ষ ও নিজেদের শক্তি-দুর্বলতা বিবেচনা করেই এমন উইকেট তৈরি করা হয়েছে। কথাটি হয়তো সত্যি, কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই বিবেচনাটি কতদিন আগে করা হয়েছিল?
উইকেট তৈরির সিদ্ধান্তটি যে খুব পরিকল্পিত বা সময়মতো নেওয়া হয়নি, তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে মিরপুর টেস্টের আগে। কেমন উইকেট হবে, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় দ্বিধায় ছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। শেষ মুহূর্তে এসে স্পোর্টিং থেকে স্পিনে বদলে যাওয়া মিরপুর টেস্টের উইকেট দেখলেই তা বোঝা যায়।
অথচ চতুর্থ দিনেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানরা বাংলাদেশের স্পিনারদের বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে খেলেছেন। ম্যাচ শেষে অধিনায়ক নাজমুল আফসোস করে জানান, তাঁর বোলাররা লেংথটা ঠিকঠাক বুঝতে পারেননি। না হলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটসম্যানদের আরও চেপে ধরা যেত।
ব্যাটসম্যানদের দুর্বলতা স্পিনে, আবার নিজেদের স্পিনারদের পারফরম্যান্স নিয়েও সংশয়—তাহলে কেন এমন উইকেট তৈরি করা হলো, সেই প্রশ্নটিই থেকে যায়। যখন স্পিন উইকেটে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তখনও বাংলাদেশ সেটির জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত হতে পারেনি। মিরপুর টেস্টের একাদশে থাকা ৬ জন ক্রিকেটার তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে ব্যস্ত ছিলেন। তাঁরা দেশে ফেরার পর পুরো দল একসঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পেয়েছে মাত্র দুই দিন।
এর মধ্যে একদিন কয়েকজন ক্রিকেটার ঘরোয়া এক টুর্নামেন্টের নিলাম থেকে তাড়াহুড়া করে এসে দলের অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন। তাঁদের কারও কারও ম্যাচ পরিস্থিতি বিবেচনা না করে শট খেলা যেমন বিস্ময় জাগিয়েছে, তেমনি টেস্টের জন্য তাঁদের প্রস্তুতি যথাযথ ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রায় কোনো দলেরই দম ফেলার ফুরসত থাকে না। তবু দলগুলো নিজেদের অগ্রাধিকার ঠিক করে এগোয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই টেস্ট সিরিজটি বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কারণ, এই সিরিজে দুই টেস্ট জিততে পারলে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে খেলার সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হতো।
অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ সিরিজের মাত্র দুই দিন আগে আরব আমিরাতের তীব্র গরমে ম্যাচ খেলে দেশে ফিরতে হয়েছে ক্রিকেটারদের। ন্যূনতম বিশ্রামের সুযোগ না দিয়েই নামতে হয়েছে টেস্ট খেলতে। আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়েকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজটি আইসিসির ভবিষ্যৎ সফরসূচিতে ছিল না। ফলে সূচি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ ছিল বিসিবির।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের গুরুত্ব বিবেচনা করে টেস্ট দলের ক্রিকেটারদের ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকে বিশ্রামে রাখা যেত, কিন্তু তা করা হয়নি। উল্টো ত্রিদেশীয় সিরিজে দুই ম্যাচের পরই যখন দলকে ঘিরে সমালোচনা শুরু হয়, তখন আরও কিছু সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
টেস্ট শুরুর মাত্র দুই দিন আগে ডোমেস্টিক থ্রি ট্রফির নিলাম আয়োজন করে বিসিবি। সেখানে ক্রিকেটারদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। শুধু তা-ই নয়, টেস্ট শুরুর তিন দিন আগে সকালে অনুশীলন করানো ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুলকে বিকেলেই সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পান মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন, যিনি জাতীয় দলের দায়িত্ব ছেড়ে হাই পারফরম্যান্স দলের কাজে মনোযোগী হয়েছিলেন।
জাতীয় দলে নিজেকে এখন ‘অতিথি’ মনে করা সালাহউদ্দীনের কাছে দায়িত্বের মেয়াদ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে তাঁর উত্তর বোর্ডের সিদ্ধান্তের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। তিনি বলেন, “আমি যদি বোর্ডের বাইরে থাকতাম তাহলে আমি অনেক কিছু বলতে পারতাম আপনাকে।”
টেস্টে উন্নতির পথে বাংলাদেশের যাত্রা কেবলই শুরু হয়েছিল। সামনে এখনো অনেকটা পথ বাকি। পরের ধাপে যেতে পারলে তা হয়ে থাকত দেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য বড় এক মাইলফলক এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা।
কিন্তু ক্রিকেটারদের মাঠের ব্যর্থতার সঙ্গে বোর্ড ও টিম ম্যানেজমেন্টের কিছু ভুল সিদ্ধান্তও যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে বড় সেই সুযোগটি বাংলাদেশ সম্ভবত হেলায় হারাল!