মিরপুর টেস্টে স্বাগতিক বাংলাদেশের পরাজয়ের পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, বাংলাদেশের স্পিনাররা প্রত্যাশিত বোলিং করতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের ঘূর্ণি সামলাতে ব্যর্থ হয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। চতুর্থ দিনে ৮ উইকেটে বড় পরাজয়ের পর গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেনও হারের কারণ হিসেবে এই বিষয়গুলোকেই ব্যাখ্যা করেছেন। টেস্টের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করলেও তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল—স্পিনের চক্করে পড়েই এই পরাজয়।

মজার বিষয় হলো, স্পিনের এই চক্করটি তৈরি করেছিল স্বাগতিক বাংলাদেশই। ঘরের মাঠের সুবিধা নিতে চাওয়াটা স্বাভাবিক, তবে সেই সুবিধা কাজে লাগানোর দক্ষতা ছিল না। বলা যায়, আমগাছে আম থাকলেও তা পাড়তে পারেনি বাংলাদেশ; বরং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আম পাড়ে নিয়ে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সিরিজ সম্প্রচারকদের এক ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেট থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা গড়ে সাড়ে ৩ ডিগ্রি টার্ন আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন। বিপরীতে, বাংলাদেশের স্পিনাররা গড়ে টার্ন পেয়েছেন মাত্র ৩ ডিগ্রি। বাংলাদেশের কোনো বলের টার্ন ৩.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছায়নি, যেখানে ক্যারিবীয় স্পিনারদের বল কখনো কখনো ৩.৭ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘুরেছে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সাধারণত এমন টার্নের সামনে খেলতে অভ্যস্ত নন। এছাড়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ স্পিনারদের টার্নগুলো ছিল ধারাবাহিক এবং আকস্মিক, আর বাংলাদেশের স্পিনারদের বল ছিল ধীরগতির ও কিছুটা নিচু।

পুরো ম্যাচের হিসাবের পাশাপাশি চতুর্থ দিন ও দ্বিতীয় ইনিংসের ব্যাটিংয়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৪২ রানে অলআউট হওয়া বাংলাদেশের ৯টি উইকেটই নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই স্পিনার। অধিনায়ক রোস্টন চেজ অফ স্পিনে নিয়েছেন ৫টি উইকেট এবং প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট পাওয়া বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান নিয়েছেন ৪টি। তাঁদের ঘূর্ণির সামনে দিশেহারা হয়ে আগের দিনের ৬ উইকেটে করা ৭৯ রানের সাথে গতকাল আর মাত্র ৬৩ রান যোগ করেই অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ।

পুরো টেস্টে বাংলাদেশের ২০টি উইকেটের মধ্যে ১৬টিই নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা, যা শতকরা হিসেবে মোট উইকেটের ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্পিনাররা দুই ইনিংস মিলিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ১২ উইকেটের মধ্যে নিয়েছেন ৮টি, যা মোট উইকেটের ৬০ শতাংশ। তবে কেবল উইকেটের সংখ্যা দিয়ে দুই দলের স্পিনারদের তুলনা করা সঠিক হবে না; আসল পার্থক্য ছিল বলের বাঁক বা টার্নের মাত্রায়।

এই কারণেই ঘরের মাঠেও ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানদের সমস্যায় ফেলতে পারেননি বাংলাদেশের স্পিনাররা। ফলে চতুর্থ ইনিংসে ১৭০ রানের স্বল্প লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে রীতিমতো ওয়ানডে মেজাজে ম্যাচ শেষ করে দিয়েছে সফরকারী দল। এক দিনের বেশি সময় হাতে রেখেও মাত্র ৩৫.১ ওভারে টেস্টটি জিতে নেয় তারা।

গতকাল লাঞ্চের আগেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস, যার ফলে লিড দাঁড়ায় মাত্র ১৬৯ রান। এই লিড আরও বেশি হতে পারত যদি না বল হাতে ৪ উইকেট পাওয়ার পর ব্যাট হাতে নিজের প্রথম ফিফটি না করতেন নাঈম হাসান। পরশু ৫৩ রানে ৬ উইকেট পড়ার পর উইকেটে আসেন নাঈম। বাংলাদেশ যেটুকু লিড নিতে পেরেছে, শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হওয়া নাঈমকে তার জন্য বিশেষ কৃতিত্ব দিতে হবে।

তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফিল্ডারদের ভুলে পাওয়া সুযোগগুলো ব্যাটসম্যানরা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি। নাঈম দুইবার এবং হাসান মাহমুদ একবার জীবন পেলেও রান তোলা যায় মাত্র ১৪২। আগের দিনের ৭৯ রানের সাথে আর মাত্র ৬৩ রান যোগ করেই শেষ হয়ে যায় বাংলাদেশের লড়াই।

আলোকস্বল্পতা, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে টেস্টের চার দিনে মোট ৯ বার খেলা বন্ধ হয়েছে। প্রথম তিন দিনে নির্ধারিত ২৭০ ওভারের জায়গায় প্রায় ৬০ ওভার কম খেলা হয়েছে। গতকাল দ্বিতীয় ইনিংসের শেষ দিকে একবার বৃষ্টিতে খেলা থেমেছিল। লাঞ্চের আগে এক ওভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসটিও বিভিন্ন কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

এত বাধা সত্ত্বেও ছোট লক্ষ্যের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শরীফুল ইসলাম জন ক্যাম্পবেলের স্টাম্প উপড়ে ফেলার আগে ব্রেন্ডন কিংয়ের সঙ্গে তাঁর ওপেনিং জুটিতে হয় ১১২ রান। কিং শেষ পর্যন্ত ৮১ রানে অপরাজিত থাকেন এবং কেবন হজ অপরাজিত থাকেন ৩১ রানে। দলের ১২০ রানে তেজনারায়ণের আউটের পর তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৫০ রানের জুটিতেই ম্যাচ শেষ করে দেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

প্রথম দিনটি বাদ দিলে মিরপুর টেস্ট কখনোই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে মনে হয়নি। প্রথম ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ খুব বেশি পিছিয়ে ছিল না এবং দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথমে স্পিন দিয়ে ব্যাটসম্যানদের শাসন করা এবং পরে বাংলাদেশের স্পিনারদের গুরুত্বহীন করে দেওয়া—সব মিলিয়ে স্পিনের যে জাল বিছানো হয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য, সেই জালেই শেষ পর্যন্ত আটকে গেল বাংলাদেশ।