বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ২৭২ (সাদমান ১০৫; ওয়ারিক্যান ৫/৫৩)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংস: ১৩৪/৪ (ক্যাম্পবেল ৫৪; তাইজুল ২/৪৪)।
চোখে লেগে থাকার মতো দুটি ক্যাচ! মেহেদী হাসান মিরাজের টার্ন করে বেরিয়ে যাওয়া বল ছুঁয়ে গেল জন ক্যাম্পবেলের ব্যাট। স্লিপে বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচটা নিলেন নাজমুল হোসেন।
নাজমুলের ওই ক্যাচ ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইনিংসের ৩১তম ওভারে, পরের ক্যাচটি ৩৬তম ওভারের দ্বিতীয় বলে। বোলার এবার তাইজুল ইসলাম, ভেতরে ঢোকা বলে সিলি পয়েন্টে কাবেম হজের সহজ ক্যাচটা নিলেন মুমিনুল হক। দেখতে সহজ, আসলে ত্বরিত প্রতিক্রিয়া না দেখালে সিলি পয়েন্টে কোনো ক্যাচই সহজ নয়।
বৃষ্টিবিঘ্নিত দিনের শেষ সেশনের এই দুই দারুণ ক্যাচের কারণেই মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনটাকে পুরোপুরি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বলার উপায় নেই। নইলে দিনের প্রথম সেশনে ৭ উইকেট হারিয়ে যেভাবে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে ঝড়ের বেগে শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস; স্বাগতিকদের তা কোনো শুভদিনের বার্তা দেয়নি।
গতকাল প্রথম দিন শেষে ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীনের আশাবাদ ছিল প্রথম ইনিংসে অন্তত চার শ রান করার। সেখানে আজ এক সেশন ব্যাট করে লাঞ্চের আগেই ২৭২ রানে অলআউট হয়ে যাওয়া কতটা হতাশাজনক হতে পারে, তা তো বুঝতেই পারছেন। ব্যাপারটা আরও ভালোভাবে বুঝবেন এই দুটি তথ্য থেকে—বাংলাদেশ আজ শেষ ৭ উইকেট হারিয়ে তুলেছে মাত্র ৫৯ রান, শেষ ৫ উইকেট পড়েছে মাত্র ১৯ রানে।
তবে দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোরবোর্ডের দিকে তাকালে ব্যাটিং নিয়ে হতাশা কিছুটা কমেই আসবে। বৃষ্টিতে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পরও ওয়েস্ট ইন্ডিজ যে ৪৮ ওভার ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেয়েছে, তাতেই তাদের ৪ উইকেট তুলে নিয়েছেন বাংলাদেশের বোলাররা। দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রান ১৩৪।
চা–বিরতির সময়টাও অবশ্য ঢুকে গেছে বৃষ্টিবিরতির মধ্যে। আর বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল চা–বিরতির নির্ধারিত সময়ের একটু আগে আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ থাকার সময়। দিনের শেষটাও হয়েছে আলোকস্বল্পতায় খেলা বন্ধ হয়ে। দুই ইনিংস মিলিয়েই সারা দিনে খেলা হতে পেরেছে ৭১.৪ ওভার, আগের দিন হয়েছিল ৭৪ ওভার।
শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেটে স্পিনাররা শুরু থেকেই টার্ন পাচ্ছেন ঠিক আছে, কিন্তু আজ বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আউটগুলোতে সেই টার্নের ভূমিকা খুব বেশি ছিল বলা যাবে না। দিনের প্রথম উইকেট ৯৯ রানে অপরাজিত থেকে প্রথম দিন শেষ করা ওপেনার সাদমান ইসলামের। সেঞ্চুরির পর আর ৫ রান যোগ করেই সাদমান এলবিডব্লু হয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিষিক্ত বাঁহাতি স্পিনার জশুয়া বিশপের রাউন্ড দ্য উইকেটে করা বলে।
এরপর তো রীতিমতো উইকেট–বৃষ্টি! সাদমান আউট হন ইনিংসের ৭৭তম ওভারে, আর বাংলাদেশ অলআউট ৯৮তম ওভারে। মাঝের সময়টায় শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের উইকেটে কী ঘটেছে, খেলা না দেখে থাকলেও নিশ্চয়ই তা বুঝতে পারছেন।
শুরুটা বিশপকে ডাউন দ্য উইকেটে তেড়ে এসে মারতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যাওয়া তাওহিদ হৃদয়কে দিয়ে। গতকাল ব্যক্তিগত ৪২ রানে থাকতে পায়ের মাংসপেশিতে টান পড়ায় স্ট্রেচারে চড়ে মাঠ ছেড়েছিলেন হৃদয়। আজ মাঠে নেমে ওই ৪২ রানে থাকতেই তাঁর ও রকম তেড়ে এসে শট খেলার চেষ্টা বিস্মিত করেছে সবাইকে।
দলকে ২২১ রানে রেখে সাদমান ও হৃদয় ফিরে আসার পর বাংলাদেশের ইনিংস টিকেছে লাঞ্চের ঠিক আগপর্যন্ত। শরীফুল ইসলামকে এলবিডব্লু করে শেষ উইকেটটি নিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান মেতেছেন টেস্টে চতুর্থবার ৫ উইকেট নেওয়ার উৎসবে। ওয়ারিক্যানের ৫টি ও বিশপের ২টি মিলিয়ে বাংলাদেশের ৭ উইকেটই নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই বাঁহাতি স্পিনার।
উইকেটে টার্ন আছে, কিন্তু চাইলে যে এখানে লম্বা ইনিংসও খেলা যায়; ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে সে উদাহরণ তো সাদমান ইসলামের ১০৫ রানের ইনিংসই। প্রথম ইনিংসে চার শ রানের লক্ষ্য স্থির করা বাংলাদেশের ২৭২ রানে অলআউট হয়ে যাওয়া থেকে তাই ভয় পাওয়ার কিছু ছিল না ক্যারিবীয়দের।
দলের ২৯ রানে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হাসান মাহমুদের বলে ওপেনার ব্রেন্ডন কিংয়ের আউটের পর আরেক ওপেনার ক্যাম্পবেল আর তেজনারায়ণ চন্দরপল মিলে গড়েন ৬১ রানের জুটি। তবে এরপর স্পিনের ধাক্কা লাগে ক্যারিবীয় পালেও।
দিন শেষে অবশ্য সেটার জন্য বৃষ্টি বিরতিকেও কিছুটা দায় দিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওপেনার ক্যাম্পবেল। বলেছেন, এ ধরনের বিরতি ছন্দ নষ্ট করে দেয়। স্কোরবোর্ডও তাই বলে। বৃষ্টির আগে ২৭ ওভারে ১ উইকেটে ৮৯ রান ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। আর বৃষ্টির পর হওয়া ২১ ওভারে ৪৫ রানে হারাতে হয়েছে ৩ উইকেট।
৪৫ রানেও তো নয়, আসলে মাত্র ৭ রানের ব্যবধানে! দলের ৯০ রানের সময় মিরাজের বলে নাজমুলের হাতে ক্যাম্পবেলের ওই দুর্দান্ত ক্যাচ, এরপর রানটা ৯৭ থাকতেই চার বলের ব্যবধানে তাইজুলের বলে ফিরেছেন হজ আর স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেওয়া আমির জাঙ্গু। আলোর অভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হওয়া দিনে বিপর্যয়টা আর বাড়তে দেয়নি চন্দরপল–জাস্টিন গ্রিভসের পঞ্চম উইকেট জুটি। ৩৭ রানের জুটি গড়ে অবিচ্ছিন্ন আছেন দুই ব্যাটসম্যান।