বিকেল ৩টা ১৫ মিনিট। হঠাৎ করেই অন্ধকার নেমে এল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে। মাঠের আবহের চেয়েও আম্পায়ারদের লাইট মিটারে আলোর স্বল্পতা ধরা পড়ল বেশি। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে বন্ধ হয়ে গেল খেলা। অথচ দিনের তখনও ২০ ওভার বাকি ছিল। তার চেয়েও বড় কথা, টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরির খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন সাদমান ইসলাম; তিনি ছিলেন অপরাজিত ৯৬ রানে।
একটি পর্যায়ে মনে হয়েছিল দিনের খেলা আর শুরু হবে না। তবে কিছুক্ষণ পরেই শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে বিকেলের রোদ ফিরে এল। আলোকস্বল্পতার কারণে ৫৩ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পর পুনরায় শুরু হয় লড়াই। সবার মনে স্বস্তি জাগল যে, সাদমান হয়তো আজই সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ করতে পারবেন।
কিন্তু ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা, আর মিরপুরের আকাশের আলো যেন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠল। মাত্র ৪ ওভার খেলা হওয়ার পর আবারও আলোকস্বল্পতা দেখা দিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর শেষ হয়ে গেল দিনের খেলা। টেলিভিশনের পর্দায় তখন বিষণ্ণ হাসিতে ফুটে উঠল সাদমানের চেহারা। কারণ, সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরেই রয়ে গেলেন তিনি; অপরাজিত ৯৯ রানে দিন শেষ করলেন এই ওপেনার।
বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার এই মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনে মূল নাটকটি ছিল এই আলো নিয়ে। তা না হলে দিনটি ছিল বেশ ঘটনাহীন। টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের মাত্র ৩টি উইকেট পড়েছে এবং সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ২১৩ রানে। সেশন অনুযায়ী হিসাব করলে দেখা যায়, প্রথম সেশনে ২ উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ ছিল ৯৬ রান, দ্বিতীয় সেশনে ১ উইকেট হারিয়ে ৮১ রান এবং অসম্পূর্ণ শেষ সেশনে রান হয়েছে ৩৬টি।
শেষ সেশনে বাংলাদেশ কোনো উইকেট না হারালেও একটি দুঃসংবাদ ছিল। পায়ের মাংসপেশিতে টান পড়ায় স্ট্রেচারে চড়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে ৪২ রান করা তাওহিদ হৃদয়কে। তবে ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, আজ সন্ধ্যার মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।
সামগ্রিকভাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের অনুকূলে ছিল বলা যায়। প্রথম দিনের তুলনায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনাররা উইকেট থেকে ভালো টার্ন পেয়েছেন এবং সকালে পেসারদের বলে মুভমেন্ট দেখা গেছে। দিন শেষে সালাহউদ্দীন বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে উইকেটে বোলারদের জন্য কিছু আছে।’ তবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য কোনো ক্যারিবীয় বোলারই আজ বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারেননি। ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর প্রভাব বলতে ছিল দুপুরের পর আকাশের কালো মেঘ, যা শেষ পর্যন্ত প্রথম দিনের খেলা দ্রুত শেষ হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াল।
সাদমানের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল এই আলো, যার ফলে তাকে আরও এক রাত অপেক্ষা করতে হবে। গত বছরের এপ্রিলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। এরপর আজকের আগে ১৭ ইনিংসে চারটি ফিফটি করলেও তিন অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পারেননি এই ওপেনার। আজ সেই বাধা ডিঙানোর একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছিলেন তিনি। খেলা বন্ধ হওয়ার সময় ২১৯ বলে অপরাজিত ৯৯ রানে ছিলেন সাদমান।
সাদমান সেঞ্চুরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে দিন শেষ করলেও অন্য কোনো ব্যাটসম্যান বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। চোটের কারণে তৃতীয় উইকেটে সাদমানের ৮৮ রানের জুটির সঙ্গী হৃদয় ইনিংস শেষ করতে পারেননি। মুমিনুল হক এবং অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের সম্ভাবনা ছিল বড় ইনিংস খেলার, কারণ দুজনই উইকেটে থিতু হয়েছিলেন।
তবে মুমিনুলের ক্ষেত্রে এখন যেন থিতু হয়েও আউট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। এরপর ১৬ ইনিংসে ৯টি ফিফটি করেছেন, যার মধ্যে ৮০-র ওপরে তিনটি এবং ৯০-র ওপরে একটি ইনিংস থাকলেও তিন অঙ্কের দেখা পাননি।
ফিফটি না পেলেও থিতু হয়ে আউট হওয়ার ধারাবাহিকতা আজকেও বজায় রাখলেন তিনি। ব্যক্তিগত ২৮ রানে জোমেল ওয়ারিকানের বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া বলের ফাঁদে পড়ে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে মারতে গিয়ে ভুল করেন মুমিনুল। ব্যাটে-বলে সঠিক সংযোগ না হওয়ায় মিড অফে শামার জোসেফের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। শট খেলার এই লোভে না পড়লে মুমিনুলের ইনিংসটি আরও বড় হতে পারত।
লাঞ্চের পর সপ্তম ওভারে ফিরেছিলেন নাজমুল। ওয়ারিক্যানকে সুইপ করতে গিয়ে বল লাগে তাঁর প্যাডে। আম্পায়ার প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের আবেদনে সাড়া না দিলেও রিভিউতে সিদ্ধান্ত বদলে যায়। ৪২ বল খেলে ১৯ রানেই সাজঘরে ফেরেন নাজমুল।
এর আগে ইনিংসের সপ্তম ওভারেই প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। নতুন বলে সকালের কন্ডিশন কাজে লাগিয়ে দারুণ বোলিং করছিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই পেসার। তানজিদের উইকেট ছিল তারই ফল। ৭ রান করে জেইডেন সিলসের বেরিয়ে যাওয়া বলে ব্যাটের বাইরের কানা লাগিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন এই ওপেনার।
তবে বাংলাদেশের দিনটি শুরু হয়েছিল দুঃসংবাদ দিয়ে। দল ঘোষণার পর দেখা যায় একাদশে নেই মুশফিকুর রহিম। আগের দিন নেটে ব্যাটিং করার সময় ডান হাতের তর্জনিতে চোট পেয়েছিলেন তিনি। এক্স-রে রিপোর্টে গুরুতর কিছু না আসায় তাঁর খেলার কথা ছিল। কিন্তু ম্যাচের আগে জানা যায়, মুশফিকের থেতলানো আঙুলের অবস্থার উন্নতি হয়নি, তাই তিনি এই টেস্টে খেলছেন না। তবে ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া সিলেট টেস্টে তিনি খেলতে পারবেন। ২০২৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের পর এই প্রথম ঘটল যে, বাংলাদেশ টেস্ট খেলছে কিন্তু মুশফিক দলে নেই। সেবারও চোটের কারণেই তিনি খেলতে পারেননি।