শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের একাডেমি মাঠের দুটি নেটে ব্যাটিং অনুশীলনে ব্যস্ত ছিলেন টেস্ট দলের চারজন ব্যাটসম্যান। সেখানে দুই স্পিনার নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলামের পাশাপাশি জাতীয় দলের পেসার ইবাদত হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। অনুশীলনের সময় দেখা গেছে, টেস্ট দলের দুই স্পিনারের পাশাপাশি নেট বোলারদের বড় একটি অংশই ছিলেন স্পিনার। তাঁদের মুখোমুখি হয়ে ব্যাটিং অনুশীলন করেন নাজমুল হোসেন, মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক এবং সাদমান ইসলাম।

স্পিন খেলার কৌশল রপ্ত করার এই প্রচেষ্টায় তাঁদের সঙ্গে ছিলেন জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল এবং সহকারী কোচ মালিবঙ্গয়ে মাকেতা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশের রণকৌশল কেমন হতে পারে, তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন সাদমান ইসলামকে নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করতে দেখা যায় আশরাফুলকে। যদিও রাতেই আশরাফুলকে ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে সকালেও থ্রোয়ারের দায়িত্ব একাই কাঁধে নিয়ে সাদমান ইসলামকে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে সুইপ ও রিভার্স সুইপ করার অনুশীলন করান তিনি। সাদমান একজন ওপেনার, তাই নতুন বলে পেস সামলানোর দায়িত্ব তাঁর বেশি। কিন্তু মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশের পরিকল্পনার একটি বড় অংশ যে স্পিনকে কেন্দ্র করে, তার ছাপই যেন ফুটে ওঠে গতকালের অনুশীলনে। অন্যথায় ওপেনারদের স্পিন খেলার বিষয়ে এত গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।

কেবল সাদমানই নন, মিরপুরে প্রায় তিন ঘণ্টার অনুশীলনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয়েছে স্পিনের বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে। শেষ পর্যন্ত মিরপুর যদি স্পিন-সহায়ক উইকেট হয়ে দাঁড়ায়, তবে কেবল বোলারদের ওপর নির্ভর করে চলবে না; ব্যাটসম্যানদেরও স্পিন খেলার দক্ষতা দেখাতে হবে।

ঘরের মাঠে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা অতীতে যেভাবে স্পিন-ফাঁদে পড়ে গিয়েছেন, সেই স্মৃতি বর্তমান ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দলের একজন সদস্য উইকেটের ধরন নিয়ে রহস্য বজায় রাখতে চেয়ে বলেন, “দেখা যাক, কেমন উইকেট হয়, আপাতত অজানাই থাকুক!”

উইকেটের ধরন যাই হোক না কেন, দলের নজর থাকবে সাদমান ইসলামের পারফরম্যান্সের দিকে। গত দুই বছরে বাংলাদেশ আলাদা আলাদা পাঁচজন ওপেনার খেলিয়েছে, তবে কেউই দীর্ঘক্ষণ থিতু হতে পারেননি।

সাদা বলের ক্রিকেট থেকে কিছুটা তাড়াহুড়ো করেই দলে আনা হয় তানজিদ হাসানকে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করার পর থেকে সাদমান ইসলামের সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে আপাতত থিতু হয়েছেন তিনি। তবে এই অদলবদল সত্ত্বেও শুরুর দিকের চিত্র খুব একটা বদলায়নি।

গত চার বছরে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচে বাংলাদেশ মাত্র একটি ১০০ রানের ওপেনিং জুটি পেয়েছে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলের চার নম্বর দল হওয়া সত্ত্বেও ১০০ পেরোনো জুটির তালিকায় বাংলাদেশ সবার শেষে অবস্থান করছে। ২০২২ সালে চট্টগ্রামের মাঠে ভারতের বিপক্ষে নাজমুল হোসেন ও জাকির হাসানের কল্যাণে সেই একমাত্র ১০০ রানের জুটিটি এসেছিল।

আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তানজিদ ও সাদমান সেঞ্চুরি পেরোনো জুটি গড়লেও সেটি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ ছিল না। এই দুজনের মধ্যে সাদমানের অবস্থান কিছুটা নড়বড়ে। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে ১০ ইনিংসে তাঁর ফিফটি মাত্র একটি এবং গড় মাত্র ২৪.১১।

বাংলাদেশের হাতে বিকল্পের অভাব রয়েছে। এবারের সিরিজে দলে কোনো তৃতীয় ওপেনার রাখা হয়নি। সৌম্য সরকারকে জাতীয় দলের সঙ্গে দুটি সিরিজ ঘুরিয়ে একাদশে সুযোগ না দিয়েই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচকেরা তাঁকে জাতীয় লিগে রান করতে দেখতে চান।

সম্ভাব্য ওপেনার হিসেবে মাহফিজুল ইসলামকেও বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে। তবে জাতীয় লিগে ৭ ইনিংসে তিনটি সেঞ্চুরি করলেও তিনি যে ধরনের প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রান করেছেন, তা নিয়ে নির্বাচকেরা সন্তুষ্ট নন। বিসিবি একাদশের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে সুযোগ পেয়ে তিনি মাত্র ৪ রান করে আউট হয়ে যান।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশের জন্য এখন তৃতীয় ওপেনারের জায়গাটি কার্যত শূন্য। তবে তার আগে টিম ম্যানেজমেন্টের প্রত্যাশা, সাদমান ও তানজিদ যেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই সিরিজে সফল হন। অন্যথায় ওপেনিংয়ের এই দুশ্চিন্তা আরও বাড়বে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই পরীক্ষায় নতুন বলের পেস-সুইং সামলানোর পাশাপাশি স্পিন-সহায়ক উইকেটে ঘূর্ণিও সামাল দিতে হবে বাংলাদেশের ওপেনারদের।