সেঞ্চুরি থেকে মাত্র এক রান দূরে। অথচ সেই এক রানই যেন এখন অনেক দূরের পথ বলে মনে হচ্ছে। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় প্রথম যখন ‘আলোকস্বল্পতায় খেলা বন্ধ’ লেখা ভেসে উঠল, তখন সাদমান ইসলামের সংগ্রহ ছিল ৯৬ রান। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পুনরায় খেলা শুরু হলেও ২০ মিনিট যেতে নািতেই আবারও আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা স্থগিত করতে হয়। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সাদমান অপরাজিত ৯৯ রানেই থেমে থাকেন।

টেস্টের প্রথম দিনে খেলা বন্ধ হওয়ার বিষয়ে সাধারণত কোনো দলেরই খুব একটা আপত্তি থাকে না। তবে সাদমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি সেঞ্চুরির জন্য তাঁর দীর্ঘ অপেক্ষা এমনিতেই চলছিল। এবার সেই অপেক্ষার সাথে যুক্ত হলো আরও একটি রাত।

সাদমানের সর্বশেষ টেস্ট সেঞ্চুরি এসেছিল ১৭ ইনিংস আগে। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২১টি ম্যাচে অংশ নিলেও তিনি কোনো সেঞ্চুরি করতে পারেননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে সেই আক্ষেপ ঘুচানোর সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ৯৯ থেকে ১০০তে পৌঁছানোর জন্য এখন তাঁকে আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

এই অপেক্ষার সঙ্গী কেবল সাদমান নন, বরং পুরো বাংলাদেশ দল। দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে জাতীয় দলের অন্তর্বর্তীকালীন ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন বলেন, “আমরা পুরো দলই আসলে নার্ভাস। সবাই চাচ্ছিলাম যেন ওর সেঞ্চুরিটা হয়ে যায়। কারণ, প্রায় ৩০টার মতো টেস্ট খেলে মাত্র ২টা সেঞ্চুরি। আমার মনে হয়, এই সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল।”

সাদমানের জন্য এই সেঞ্চুরিটি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দীন বলেন, “আশা করব, এটা হলে সে আরও বেশি বুঝতে পারবে যে সেঞ্চুরি মারতে হলে কী করতে হবে। আমার মনে হয়, এই ইনিংসটা তার পরবর্তী জীবনে অনেক সাহায্য করতে পারে।”

সাদমানের মূল সমস্যা রান করতে না পারা নয়, বরং রান করার পর ইনিংসটিকে বড় করতে না পারা। গত তিন বছরে টেস্টে ওপেনারদের মধ্যে রান সংগ্রহের দিক থেকে সপ্তম অবস্থানে আছেন সাদমান। এই সময়ে তিনি ৮টি ফিফটি করলেও সেঞ্চুরি করতে পেরেছেন মাত্র একটি। তাঁর ওপর থাকা ছয় ব্যাটসম্যানের প্রত্যেকেরই ফিফটিকে সেঞ্চুরিতে রূপান্তরের হার অনেক বেশি। ব্যাটিংয়ের ভাষায় যাকে ‘কনভারশন রেট’ বলা হয়, সাদমানের সমস্যাটি ঠিক সেখানেই। সালাহউদ্দীনের ধারণা, এই সমস্যাটি এখন সাদমান নিজেও উপলব্ধি করতে পারছেন। তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, ও নিজেও হয়তো বুঝতে পারছে, হয়তো কোচের সঙ্গে কথা বলেছে। কারণ, ওর কনভারশন রেটটা আসলে খুব বেশি নয়। অনেকগুলো ইনিংসেই কিন্তু খুব ভালোভাবে ফিফটি করেছে, কিন্তু ওটা সে লম্বা করতে পারেনি। হয়তো মধ্যে কোনো প্রসেসে তার সমস্যা ছিল।”

মিরপুর টেস্টের প্রথম দিন শেষে ৩ উইকেটে ২১৩ রান তুলেছে বাংলাদেশ। বড় সংগ্রহের মজবুত ভিত তৈরি হলেও দিনটি আরও ভালো হতে পারত। বিশেষ করে উইকেট পতনের ধরন নিয়ে কিছুটা আক্ষেপ থেকে যায়। তানজিদ হাসান ড্রাইভ করতে গিয়ে স্লিপে ক্যাচ দেন এবং নাজমুল হোসেন সুইপ শট খেলতে গিয়ে এলবিডব্লু হয়ে মাঠ ছাড়েন। তবে সবচেয়ে বেশি আক্ষেপ সম্ভবত মুমিনুল হককে নিয়ে। জোমেল ওয়ারিকনের বলে এগিয়ে এসে মিড অফের ওপর দিয়ে খেলতে চেয়েছিলেন মুমিনুল, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে জশুয়া বিশপের হাতে ক্যাচ দেন। মুমিনুলের এই আউট হওয়া যেন তাঁর সাম্প্রতিক ব্যাটিংয়েরই প্রতিচ্ছবি। তিনি রান পাচ্ছেন, ফিফটিও করছেন, কিন্তু সেঞ্চুরির দেখা মিলছে না।

২০২৪ সালে কানপুরে ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর ৩১ ইনিংসে ১০২৮ রান করেছেন মুমিনুল। এই সময়ে তিনি ৯টি ফিফটি করলেও সেঞ্চুরি করতে পারেননি একটিও। এই নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কেবল নাজমুল হোসেনই তাঁর চেয়ে বেশি রান করেছেন। অর্থাৎ, মুমিনুল রান-খরায় ভুগছেন না, বরং সমস্যাটি সেই ইনিংস বড় করতে না পারাতেই। ভালো শুরুর পর কোথাও যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে তাঁর।

অভিজ্ঞ মুমিনুলের কাছ থেকেও দ্রুত একটি সেঞ্চুরি দেখতে চান সালাহউদ্দীন। তবে এই সমস্যার সমাধান মুমিনুলকেই খুঁজে নিতে হবে বলে মনে করেন তিনি। কোচ বলেন, “প্রতিবারই যদি একই ধরনের ভুল হতে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই কোথাও কোনো সমস্যা আছে। আমার মনে হয়, কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সেই উপায়টা তাকেই খুঁজে বের করতে হবে। সে যেহেতু অভিজ্ঞ, আশা করি বিষয়টা সে দ্রুত বুঝতে পারবে।”