হাই পারফরম্যান্স ইউনিটকে (এইচপি) নতুন আঙ্গিকে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এখন থেকে দীর্ঘ কোচিং প্যানেল এবং বিশেষায়িত সুবিধার মাধ্যমে সারা বছর ধরে চলবে ক্রিকেটারদের ক্যাম্প ও নিয়মিত মনিটরিং। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জাতীয় দলের সাবেক সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দীনকে। এশিয়ান গেমসের উদ্দেশে দেশ ছাড়ার আগে এক সাক্ষাৎকারে এইচপি নিয়ে তাঁর বিস্তারিত পরিকল্পনা জানিয়েছেন সালাহউদ্দীন।

এইচপির কার্যক্রমের পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "এইচপির প্রোগ্রাম আগে সাধারণত তিন মাস বা চার মাসের হতো। এখন এটা সারা বছর ধরে চলবে। এইচপির ছেলেরা তিন–চার মাস পর কোথায় গেল না গেল, আগে আমরা কোনো খোঁজখবর রাখতাম না। এখন সারা বছর তারা মনিটরিংয়ের মধ্যে থাকবে। যখন তারা বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাবে, তখনো মনিটরিংয়ে থাকবে। এই খেলোয়াড়েরা যেন সারা বছর সর্বোচ্চ অনুশীলন সুবিধা পায়, তা দেখা হবে।"

এইচপির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে সালাহউদ্দীন জানান, "আমাদের মূল লক্ষ্য ক্রিকেটারদের জাতীয় দলে আনা হবে না। জাতীয় দলের জন্য বিকল্প খেলোয়াড়ের চিন্তা থাকবে, তবে এইচপির মূল লক্ষ্য হবে এই ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক মানের মতো করে গড়ে তোলা। আমি একটা ছেলেকে এনে জাতীয় দলে পাঠিয়ে দেব, এটা কোনো কোচের স্বপ্ন হতে পারে না। সে ওই জায়গায় গিয়ে কত দিন টিকে থাকতে পারবে, সর্বোচ্চ মানে গেল কি না, সেটাই আসল। আমাদের খেলোয়াড়দের এখন সর্বোচ্চ যে মানটা আছে, আমরা যেন সেটাকে অতিক্রম করে যেতে পারি—এটাই হবে এইচপির লক্ষ্য। সেটি ক্রিকেট সংস্কৃতি, টেকনিক্যাল দিক, ট্যাকটিকস—সব দিক দিয়েই। আমরা এখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের জন্য একই স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দিচ্ছি। এইচপির জন্যও ও রকম স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে সেটাকে তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।"

স্কোয়াড প্রসঙ্গে তিনি জানান, জাতীয় লিগের পর এইচপির স্কোয়াড ঘোষণা করা হবে। যাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশ দলকে এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আছে, তাদেরই এই দলে নেওয়া হবে।

এইচপির সুবিধার পরিধি বাড়িয়ে এতে 'টাইগার্স' প্রোগ্রাম এবং রিহ্যাব কার্যক্রমকেও অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। সালাহউদ্দীন বলেন, "জাতীয় দল বা এর আশপাশের খেলোয়াড়েরা প্রয়োজনবোধে ১০–১৫ দিনের জন্য এইচপিতে এসে বিশেষ কিছু নিয়ে অনুশীলন করতে পারবে। হয়তো তারা অফ ফর্মে আছে, আমরা আমাদের কোচ দিয়ে তাদের অনুশীলন করাব, চেষ্টা করব তাদের আবার ভালো অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে।"

পেস বোলারদের জন্য আলাদা ইউনিটের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "আমাদের পেস বোলিং ইউনিটে থাকবে মূলত তরুণ বোলাররা। মূল উদ্দেশ্য, তাদের ফিটনেস আরও ভালো করা। এখানে যদি ২০ জন ভালো পেস বোলার থাকে, এইচপিতে যখন ব্যাটসম্যানরা অনুশীলন করবে, তারা ভালো বোলারের বিপক্ষে ব্যাটিং করতে পারবে। আবার জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরাও এখানে এলে ভালো বোলারদের বিপক্ষে খেলতে পারবে। এই বোলাররাও মানসিকভাবে দৃঢ় হয়ে উঠবে। কারণ, তারা ভালো ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বল করবে।"

বিসিবির রিহ্যাব প্রোগ্রামের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, রিহ্যাব প্রধান মারিও ভিল্লাভারায়েনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে এখানে। বিশেষ করে পেসারদের ক্ষেত্রে বোলিং অ্যাকশনের সমস্যা সমাধানে কোচদের সম্পৃক্ত করা হবে যাতে তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরতে পারে।

কোচিং প্যানেল নিয়ে সালাহউদ্দীন জানান, আগে যেখানে তিন-চারজন কোচ থাকতেন, এখন ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং মিলিয়ে প্রায় ১২-১৩ জনের একটি বড় প্যানেল থাকবে। এতে সোহেল ইসলাম, মিজানুর রহমান, মাহমুদউল্লাহ, আবদুর রাজ্জাক, আশিক এবং তালহা জুবায়েরের মতো অভিজ্ঞরা কাজ করবেন। পাশাপাশি তরুণ কোচদের গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, "ঘাটতির জায়গাগুলোতে বাইরের বিশেষজ্ঞদের এনে খণ্ডকালীন কাজ করানোর চিন্তা আছে। ১০–১৫ দিনের বিশেষ ক্যাম্প—এ রকম।"

অনুশীলন সুবিধার বিষয়ে তিনি জানান, মিরপুরের একাডেমি মাঠটি এইচপির অধীনে আসবে এবং সেখানে আরও ২০টি উইকেট তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। জিম ও সুইমিং পুলের সুবিধাও থাকবে, তবে ভবিষ্যতে পুরো এইচপি পূর্বাচলে স্থানান্তরিত হবে।

জাতীয় দলের সহকারী কোচ থেকে এইচপির দায়িত্ব নেওয়ার অনুপ্রেরণা সম্পর্কে সালাহউদ্দীন বলেন, "ক্রিকেটে কাজের জন্য ডেভেলপমেন্টের জায়গাটাই বেশি উপভোগ্য মনে হয় আমার কাছে। আপনি যখন কিছুতে উন্নতি আনতে যাবেন, তখনই চ্যালেঞ্জটা বেশি থাকে। একজন খেলোয়াড় ভালো খেলোয়াড় হয় উঠলে সবারই ভালো লাগে। কোচের মানসিক শান্তি তো এটাই যে সে একজন ভালো খেলোয়াড় তৈরি করতে পারল।"