ক্রিকেট বিশ্বে এমন কিছু খেলোয়াড় থাকেন, যাঁদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফর্মের অবনতি ঘটে এবং ব্যাটে রান আসা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে বড় ম্যাচের আগে তাঁদের বাদ দেওয়ার কথা ভাবলেই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে পুরোনো কোনো ফাইনালের অবিশ্বাস্য ইনিংস কিংবা অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। পাকিস্তানের ক্রিকেটে ফখর জামান ঠিক তেমনই একজন নাম।
ফখরকে নিয়ে পাকিস্তানের ম্যানেজমেন্টের দ্বিধা কেবল একজন ব্যাটসম্যানকে দলে রাখা বা না-রাখার বিষয়ে ছিল না; বরং এটি ছিল অতীতের গৌরবময় স্মৃতির সাথে বর্তমানের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের এক লড়াই। একদিকে তাঁর সাম্প্রতিক ব্যর্থতা, অন্যদিকে বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠার এক দীর্ঘ ইতিহাস।
চলতি ত্রিদেশীয় সিরিজে ফখরের সময়টা মোটেও ভালো যাচ্ছিল না। প্রথম চার ম্যাচে তিনি রান করতে পেরেছেন মাত্র ৩১ রান। বিশেষ করে শর্ট বলের সামনে তাঁকে বারবার অসহায় দেখা গেছে। এর আগে টি-টোয়েন্টি সিরিজেও বড় কোনো ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি।
ফাইনালে যাওয়ার আগে তাই ফখরকে বাদ দেওয়ার আলোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। তবে বড় ম্যাচে তাঁর অসাধারণ অতীত রেকর্ডই শেষ পর্যন্ত তাঁকে একাদশে জায়গা করে দেয়।
স্মরণীয় সেই ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তাঁর করা সেঞ্চুরি এখনো পাকিস্তান ক্রিকেটের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। এরপর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালেও ৪৬ বলে ৯১ রান করে দলকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন তিনি।
লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে আয়োজিত ফাইনালে শ্রীলঙ্কা আগে ব্যাট করে পাকিস্তানকে ৩২৬ রানের এক পাহাড়প্রমাণ লক্ষ্য দেয়। ওয়ানডে ফাইনালের ইতিহাসে যৌথভাবে সর্বোচ্চ লক্ষ্য এটি। রান তাড়ায় নেমে পাকিস্তান শুরুতেই ধাক্কা খায়; ২১ বলের মধ্যেই প্রথম তিন ব্যাটসম্যানের দুজনকে হারায় তারা। অধিনায়ক বাবর আজম শূন্য রানেই বিদায় নেন।
ফখর জামানও প্রায় ফিরে যাচ্ছিলেন। আসিতা ফার্নান্দোর বলে তাঁর করা একটি কাট শট ডিপ থার্ডে ক্যাচ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে দিলশান মাদুশঙ্কা ক্যাচ ধরতে গিয়ে ব্যর্থ হন এবং বল তাঁর হাতে লেগে সীমানার বাইরে চলে যায়। সেই জীবন পেয়েই যেন নতুন করে শুরু করেন ফখর।
তাঁর সাথে যোগ দেন তরুণ তুর্কি সাদ বেগ। এই দুজনের অসাধারণ জুটিতে যোগ হয় ১৪৯ রান, যার মধ্যে সাদ করেন ৭৪ রান।
ম্যাচ শেষে সাদ বেগের অবদানকে গুরুত্ব দিতে ভুল করেননি ফখর। তিনি বলেন, “সাদ যখন ব্যাট করতে আসে, তখন আমি কিছুটা স্ট্রাগল করছিলাম। ও খুব দ্রুত রান তুলেছে। তাতে আমি স্বস্তি পেয়েছি। ও যদি ধীরে খেলত, তাহলে হয়তো আমাকে ঝুঁকি নিতে হতো। উইকেটও হারাতে পারতাম। ও যেভাবে শুরু করেছে এবং ইনিংস গড়েছে, কৃতিত্ব ওরই।”
পরিসংখ্যান বলছে, ৩০০ বা তার বেশি রান তাড়া করে জেতা ওয়ানডে ম্যাচে ফখরের গড় ৬০-এর বেশি। এমন ম্যাচে তাঁর চারটি সেঞ্চুরি রয়েছে, যা পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাবর আজম ও ইউনিস খানের রয়েছে তিনটি করে সেঞ্চুরি।
ফাইনালেও সেই রেকর্ডের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তিনি। ৭৪ রান করে সাদের বিদায়ের পর আসিতা ফার্নান্দোর প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকান ফখর। এরপর স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে পুল শটে পূর্ণ করেন নিজের সেঞ্চুরি। মাইলফলক ছোঁয়ার পরও তাঁর ব্যাটিংয়ের ধার কমেনি; দিলশান মাদুশঙ্কার বলে আরও একটি ছক্কা মারেন তিনি।
নিজের ব্যাটিং সম্পর্কে ফখর বলেন, “আমি যথেষ্ট ক্রিকেট খেলেছি। বুঝতে পারি, যখন আমার দিন থাকে এবং বল ব্যাটে ভালোভাবে আসে, তখন বড় শট খেলব। সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলাম। বিশেষ কিছু করিনি। আগের ম্যাচগুলোর মতোই প্রস্তুতি নিয়েছি। আমি রান করলে সবাই বলে, মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম, ফিট ছিলাম। কিন্তু প্রস্তুতি একই ছিল।
সৌভাগ্যক্রমে রান পেয়েছি। প্রথম চার ম্যাচ যেভাবে গেছে, তাতে বড় একটা ইনিংস আমার পাওনা ছিল। অনেক দিন ভালো ব্যাটিং করেও রান পাওয়া যায় না।”
ম্যাচের ২৭তম ওভারে সাদ বেগের বিদায় থেকে ৩৪তম ওভারে ফখরের আউট হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তান সংগ্রহ করেছে ৬২ রান। পুরো টুর্নামেন্টে এই নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে কোনো দল এত রান তুলতে পারেনি। এর মধ্যে একাই ৫৩ রান করেছেন ফখর।
তিনি যখন মাঠ ছাড়েন, গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের দর্শকেরা দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানান। পাকিস্তানের জয়ের জন্য তখন ওভারপ্রতি ছয়ের কিছু বেশি রান প্রয়োজন ছিল। নিজের কাজ প্রায় শেষ করে গিয়েছিলেন ফখর, যা পরবর্তী ব্যাটসম্যানদের জন্য জয়ের পথ সহজ করে দেয়।
ফাইনালে রান করার আলাদা আনন্দ নিয়ে ফখর বলেন, “আমার জন্য ভালো ব্যাপার হলো, ফাইনালে আমি রান করতে পারি। আপনি ট্রফি জেতার জন্য পারফর্ম করেন। ফাইনালে রান করতে পারলে তৃপ্তিটা বেশি।”
৩৬ বছর বয়স, সাম্প্রতিক ফর্ম সব সময় অনুকূলে থাকে না। ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম চার ম্যাচে ব্যর্থ হয়ে ফাইনালে এমন ইনিংস খেলা তাঁর সামর্থ্যেরই প্রমাণ। বড় ম্যাচে চাপ সামলে দলের হয়ে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা এখনো তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
ফখর হয়তো প্রতিটি ম্যাচে রান করতে পারবেন না; বয়স ও ফর্মের বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বড় মঞ্চে তাঁর দক্ষতা যে এখনো অম্লান, লাহোরের ফাইনাল সেটিই প্রমাণ করেছে। পাকিস্তানের সামনে যখনই বড় বিপদ এসেছে, ফখর জামান বারবার হয়ে উঠেছেন নির্ভরযোগ্য ভরসা।