শ্রীলঙ্কার দেওয়া ৩২৬ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে পাকিস্তান। মাত্র ১৪ রানেই দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে স্বাগতিকরা। রানের খাতা খোলার আগেই সাজঘরে ফিরে যান বাবর আজম। তবে এমন কঠিন পরিস্থিতির পর ফখর জামান ও সাদ বেগের দুর্দান্ত এক জুটিতে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় পাকিস্তান। যদিও তাদের বিদায়ের পর লড়াই আবারও জমে উঠেছিল, তবে শেষলগ্নে আরাফাত মিনহাসের বিধ্বংসী ব্যাটিং এবং অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদির জয়সূচক ছক্কায় ৩ উইকেটে জয় পায় পাকিস্তান। এই জয়ের মাধ্যমে ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা নিজেদের করে নিল তারা। জয়ের মূল কারিগর ফখর জামান, যিনি ৯৯ বলে ১২৭ রানের এক অসাধারণ ইনিংস খেলেছেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে আয়োজিত এই ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে মুখোমুখি হয় দুই দেশ। টস হেরে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে কামিন্দু মেন্ডিসের সেঞ্চুরির ওপর ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ৩২৫ রান সংগ্রহ করে শ্রীলঙ্কা। জবাবে ব্যাট করতে নেমে ৪৮.৩ ওভারে ৭ উইকেটে ৩৩১ রান তুলে জয় নিশ্চিত করে পাকিস্তান।
বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় পাকিস্তান। দ্বিতীয় ওভারেই দলীয় ৮ রানে মাজ সাদাকাতকে আউট করেন দিলশান মাদুশঙ্কা। ৭ বলে ৫ রান করেন এই ওপেনার। এরপর চতুর্থ ওভারে বাবর আজমকেও প্যাভিলিয়নে ফেরত পাঠান শ্রীলঙ্কার এই বাঁহাতি পেসার। পাঁচ বল খেলেও বাবর রানের খাতা খুলতে পারেননি। ১৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা।
সেই কঠিন চাপ সামাল দেন ফখর জামান ও তরুণ উইকেটরক্ষক-ব্যাটার সাদ বেগ। শুরুর ধাক্কা কাটিয়ে ধীরে ধীরে রানের গতি বাড়াতে থাকেন তারা। এক প্রান্তে সাদ দায়িত্বশীল ব্যাটিং করলেও অন্য প্রান্তে ছিলেন অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ফখর।
দুজনের এই জুটিতে ২০তম ওভারে দলীয় শতরান পূর্ণ করে পাকিস্তান। এরই মধ্যে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক স্পর্শ করেন সাদ। কিছুক্ষণ পরেই নিজের ফিফটি পূর্ণ করেন ফখরও। এই দুজনের ব্যাটিংয়ের ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে পাকিস্তানের হাতে চলে আসে।
তবে ২৭তম ওভারে মাহিশ থিকশানা এই জুটিটি ভাঙেন। নিজের বলে ক্যাচ নিয়ে সাদকে আউট করেন তিনি। ৭৫ বলে ১১টি চারের সাহায্যে ৭৪ রান করেন পাকিস্তানের এই তরুণ ব্যাটার। ফখরের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে তাদের জুটিতে আসে ১৪৯ রান।
সাদ বিদায় নিলেও ফখর থামেননি। ৩০তম ওভারে আসিথা ফার্নান্দোকে চার মেরে ৮৩ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন এই বাঁহাতি ওপেনার। এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বাদশ শতক। সেঞ্চুরির পরও তার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং অব্যাহত থাকে।
অবশেষে ৩৪তম ওভারে ফখরকে বোল্ড করেন মাদুশঙ্কা। ৯৯ বলে ১১টি চার ও ছয়টি ছক্কায় ১২৭ রান করেন পাকিস্তানি ওপেনার। তার বিদায়ের সময় দলের সংগ্রহ ছিল ৪ উইকেটে ২২০ রান। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ছিল ১০৬ রান।
এরপর আবারও চাপে পড়ে পাকিস্তান। ৩৭তম ওভারে সালমান আলী আগাকে বোল্ড করেন দুনিথ ভেল্লালাগে। ২৫ বলে ১৭ রান করে ফেরেন তিনি। ২৩০ রানে পাঁচ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা হারায় স্বাগতিকরা। শেষ ৭৮ বলে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৯৬ রান।
সেখান থেকে পাকিস্তানকে জয়ের পথে ফেরান হাসান নওয়াজ ও আরাফাত মিনহাস। শুরুতে সতর্কভাবে ব্যাটিং করে জুটি গড়েন তারা। ৪০ ওভার শেষে পাকিস্তানের সংগ্রহ ছিল ২৪৪ রান। শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজন ছিল আরও ৮২ রান।
তবে শেষদিকে প্রয়োজনীয় রানরেট বাড়তে থাকলে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন মিনহাস। বিশেষ করে ৪৬তম ওভারে দাসুন শানাকার বলে ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের সমীকরণ সহজ করেন তিনি। ওই ওভার থেকে ১৫ রান তুলে নেয় পাকিস্তান। ফলে শেষ চার ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন দাঁড়ায় ৩১ রান।
এরপর আসিথা ফার্নান্দোর বলেও একাধিক বাউন্ডারি আদায় করেন মিনহাস। শেষদিকে টানা দুটি ছক্কা ও একটি চার হাঁকিয়ে পাকিস্তানকে জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেন এই তরুণ অলরাউন্ডার।
তবে শেষ মুহূর্তেও নাটকীয়তা থামেনি। ৬১ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে মিনহাস আউট হলে আবারও কিছুটা আশা ফিরে পায় শ্রীলঙ্কা। পরের বলেই ফিরে যান ফাহিম আশরাফ। অন্যদিকে ৩৬ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন হাসান নওয়াজ।
দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পরও আর বিপর্যয় ঘটতে দেননি অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি। ৪৯তম ওভারের তৃতীয় বলে ছক্কা হাঁকিয়ে পাকিস্তানের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। তখনো নয় বল বাকি ছিল ইনিংসের। শেষ পর্যন্ত তিন উইকেট হাতে রেখেই শিরোপা জয়ের আনন্দে মাতল স্বাগতিকরা।
পাকিস্তানের হয়ে ম্যাচের সবচেয়ে বড় ইনিংস খেলা ফখর জামান পান ম্যাচসেরার পুরস্কার। শ্রীলঙ্কার হয়ে দিলশান মাদুশঙ্কা সর্বোচ্চ তিন উইকেট নিলেও দলের পরাজয় ঠেকাতে পারেননি।
এর আগে শ্রীলঙ্কার ইনিংসের মূল নায়ক ছিলেন কামিন্দু মেন্ডিস। ওপেনিংয়ে নেমে ১২৮ বলে ১২টি চার ও দুটি ছক্কায় ১৩১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তিনি। এটি তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি।
কামিন্দুর সঙ্গে শুরুতে ৮৭ রানের জুটি গড়েন আভিষ্কা ফার্নান্দো। ৪৯ বলে ৩৮ রান করে সালমান আলী আগার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। এরপর অধিনায়ক কুশল মেন্ডিসও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ১২ বলে ৮ রান করে সালমানের বলেই ফিরেছেন তিনি।
দলীয় ১০৯ রানে দুই উইকেট হারানোর পর কামিন্দুর সঙ্গে জুটি বাঁধেন পবন রত্নায়েকে। তৃতীয় উইকেটে দুজন যোগ করেন ১৪৬ রান। ১০৭ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন কামিন্দু। অন্যদিকে ৬৫ বলে ৮টি চারে ৭৭ রান করেন রত্নায়েকে।
৪১তম ওভারে শ্রীলঙ্কার সংগ্রহ পৌঁছায় ২ উইকেটে ২৫৫ রানে। তখন সাড়ে তিনশর বেশি রান করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তাদের সামনে। তবে কামিন্দুকে এলবিডব্লিউ করে পাকিস্তানকে ম্যাচে ফেরান অধিনায়ক শাহিন শাহ আফ্রিদি।
এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে শ্রীলঙ্কা। শেষ ১০ ওভারে ৮৭ রান যোগ করলেও ছয় উইকেট হারায় তারা। পাকিস্তানের হয়ে শাহিন, সালমান, হারিস রউফ ও নাসিম শাহ দুটি করে উইকেট নেন।
শ্রীলঙ্কার বড় সংগ্রহের পরও শেষ পর্যন্ত সেটি যথেষ্ট হয়নি। ফখরের সেঞ্চুরি, সাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্ধশতক, হাসান নওয়াজের দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং মিনহাসের শেষদিকের আক্রমণাত্মক ইনিংসে শিরোপা নিশ্চিত করে পাকিস্তান।
এর আগে গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কার কাছে মাত্র ১১০ রানে অলআউট হয়ে ৮ উইকেটে হেরেছিল পাকিস্তান। ফাইনালে সেই প্রতিপক্ষকে হারিয়ে মধুর প্রতিশোধও নিল শাহিনের দল। একই সঙ্গে ঘরের মাঠে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জয়ের অপেক্ষার অবসান ঘটাল পাকিস্তান।