কোচ বদলের গুঞ্জন সামলে মাইকেল ক্যারিককে আরও একটি সুযোগ দিয়েছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। কিন্তু মাঠের পারফরম্যান্সে সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পারলেন না তার শিষ্যরা। প্রথমার্ধে একাধিক সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে না পারার মাশুল দিতে হলো দ্বিতীয়ার্ধে। রক্ষণভাগের ভুল, লিসান্দ্রো মার্তিনেজের লাল কার্ড এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে চেলসির কাছে ২-০ গোলে হারল ইউনাইটেড। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা নবম ম্যাচে জয়হীন থাকল ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল ক্লাবটি।

১৯৮৮ সালের পর প্রথমবার এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে তারা। এই হারে কোচ ক্যারিকের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

শনিবার (৩১ অক্টোবর) লন্ডনের স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের নবম রাউন্ডে মুখোমুখি হয় চেলসি ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর বিরতির পর দুই গোল করে জয় নিশ্চিত করে স্বাগতিকরা। ৫০ মিনিটে মরগান রজার্সের গোলে এগিয়ে যায় চেলসি। ৬৪ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন কোল পামার। এর ঠিক আগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ইউনাইটেডের আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।

টানা আট ম্যাচ জয়হীন থাকার পর স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে খেলতে নেমেছিল ইউনাইটেড। আগের ম্যাচে বোর্নমাউথের কাছে নিজেদের মাঠে ৩-০ গোলে হারের পর ক্যারিকের চাকরি নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়। এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে ইতালির কোমোর কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল তার দল।

টানা ব্যর্থতার পরও ক্যারিককে আরও সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। কিন্তু চেলসির বিপক্ষে আরেকটি পরাজয় তার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অথচ ম্যাচের শুরুতে তুলনামূলক ভালো খেলেছিল ইউনাইটেড। বলের দখল ও আক্রমণে চেলসির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে একাধিক সুযোগ তৈরি করে সফরকারীরা। প্রথমার্ধে অপ্টার হিসাব অনুযায়ী, ইউনাইটেডের প্রত্যাশিত গোলের পরিমাণ (এক্সজি) ছিল ১ দশমিক ০৯, যেখানে চেলসির ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ২৮। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে না পারায় এগিয়ে যাওয়া হয়নি।

প্রথমার্ধের ১৪ মিনিটেই অবশ্য বল জালে পাঠিয়েছিল চেলসি। পেদ্রো নেতোর শট ইউনাইটেড গোলরক্ষক সেন্নে লামেনস ঠেকিয়ে দেওয়ার পর ফিরতি বল থেকে গোল করেন ব্রাজিলিয়ান তরুণ এস্তেভাও। কিন্তু অফসাইডের কারণে সেটি বাতিল হয়।

এরপর ইউনাইটেডের সামনে গোলের ভালো সুযোগ আসে। দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ব্রায়ান এমবেউমোর বাড়ানো বল পেয়ে শট নিলেও লক্ষ্যভেদ করতে পারেননি ব্রুনো ফার্নান্দেজ। কিছুক্ষণ পর আমাদ দিয়ালোর একটি শট দারুণ দক্ষতায় ফিরিয়ে দেন চেলসি গোলরক্ষক মাইক পেন্ডার্স।

৩৪ মিনিটে ইউনাইটেডের হয়ে বল জালে পাঠান মাথেউস কুনিয়া। ফার্নান্দেসের কর্নার থেকে হ্যারি ম্যাগুয়ারের হেড পেয়ে কাছ থেকে হেডেই গোল করেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) পরীক্ষায় অফসাইড ধরা পড়ায় গোলটি বাতিল হয়।

এরপরও আক্রমণ চালিয়ে যায় ইউনাইটেড। তবে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি দিয়ালো ও অন্য আক্রমণভাগের ফুটবলাররা। অন্যদিকে চেলসির ময়েসেস কাইসেদোর একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ফলে গোলশূন্য অবস্থায় শেষ হয় প্রথমার্ধ।

তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই পাল্টে যায় ম্যাচের চিত্র। ৫০ মিনিটে মাঝমাঠে ইউনাইটেডের আক্রমণ থামিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ নেন রোমেও লাভিয়া। এরপর তার পাস ধরে দ্রুত এগিয়ে যান মরগান রজার্স। হ্যারি ম্যাগুয়ার ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে পেছনে ফেলে বক্সে ঢুকে গোলরক্ষক লামেনসের মাথার ওপর দিয়ে বল জালে পাঠান ইংলিশ এই ফুটবলার।

গোল হজমের পর সমতায় ফেরার চেষ্টা করে ইউনাইটেড। ৫৩ মিনিটে ফার্নান্দেজর বিপজ্জনক ক্রসে খুব কাছ থেকে বলে পা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন কুনিয়া। সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে দ্রুতই ম্যাচে ফিরতে পারত সফরকারীরা।

এরপর পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলেন মার্তিনেজ। ৫৯ মিনিটে রজার্সকে ফাউল করে প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিজেদের বক্সে কর্নার থেকে আসা বলের জন্য লড়াইয়ের সময় ওয়েসলি ফোফানাকে কনুই দিয়ে আঘাত করেন তিনি।

ভিএআরের পরামর্শে ঘটনাটি মাঠের পাশের মনিটরে পরীক্ষা করেন রেফারি পিটার ব্যাংকস। এরপর চেলসিকে পেনাল্টি দেওয়ার পাশাপাশি মার্তিনেজকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান তিনি। ৬৩ মিনিটে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় ইউনাইটেডের বিশ্বকাপজয়ী ডিফেন্ডারকে।

পরের মিনিটেই পেনাল্টি থেকে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন কোল পামার। ইংলিশ তারকার শটের নাগাল পেলেও বল ঠেকাতে পারেননি লামেনস। তার হাত ছুঁয়ে বল জালে জড়িয়ে গেলে ২-০ গোলে এগিয়ে যায় চেলসি।

দশজনের দলে পরিণত হওয়ার পর ম্যাচে ফেরার লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়ে ইউনাইটেডের জন্য। অন্যদিকে সংখ্যাগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে বারবার আক্রমণ চালাতে থাকে চেলসি।

৭১ মিনিটে আরও একবার বল জালে পাঠান এস্তেভাও। পামারের পাস থেকে দুর্দান্ত শটে গোল করেছিলেন ব্রাজিলিয়ান তরুণ। তবে ভিএআর পরীক্ষায় অফসাইড ধরা পড়ায় দ্বিতীয়বারের মতো তার গোল বাতিল হয়।

শেষদিকে ব্যবধান কমানোর সুযোগ পেয়েছিল ইউনাইটেড। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ব্রায়ান এমবেউমোর জোরালো শট দুর্দান্তভাবে ঠেকিয়ে দেন চেলসি গোলরক্ষক পেন্ডার্স। তার আঙুলের ছোঁয়ায় বল ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ফলে শেষ পর্যন্ত গোলের খাতা খুলতে পারেনি সফরকারীরা।

এই জয়ে সাম্প্রতিক ব্যর্থতা কাটিয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেল জাবি আলোনসোর চেলসি। আগের দুই ম্যাচে হারের পর এই জয়ে নয় ম্যাচে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে আপাতত প্রিমিয়ার লিগের চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে লন্ডনের ক্লাবটি।

অন্যদিকে ইউনাইটেডের সংকট আরও গভীর হলো। প্রিমিয়ার লিগে মৌসুমের প্রথম নয় ম্যাচে মাত্র একটি জয় পেয়েছে ক্যারিকের দল। সাত পয়েন্ট নিয়ে ১৬তম স্থানে রয়েছে তারা, অবনমন অঞ্চলের চেয়ে মাত্র এক পয়েন্ট ওপরে।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ইউনাইটেডের জয়হীন থাকার ধারাবাহিকতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে নয় ম্যাচে। এই সময়ে ছয়টি ম্যাচ হেরেছে তারা, ড্র করেছে বাকি তিনটি। অপ্টার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবার টানা নয় ম্যাচে জয়হীন থাকল রেড ডেভিলরা।

শুধু ফল নয়, দলের পারফরম্যান্সের ধরনও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চেলসির বিপক্ষে প্রথমার্ধে ভালো খেললেও দ্বিতীয়ার্ধে প্রায় কোনো আক্রমণই গড়ে তুলতে পারেনি ইউনাইটেড। বিরতির পর তাদের প্রত্যাশিত গোলের পরিমাণ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ০৮, যেখানে চেলসি তৈরি করেছে ২ দশমিক ৩৩ এক্সজি।

এর মধ্যে ক্যারিকের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন সূচি। আগামী মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজেদের মাঠ ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইতালির রোমার মুখোমুখি হবে ইউনাইটেড। এরপর ৮ নভেম্বর প্রিমিয়ার লিগে তাদের প্রতিপক্ষ অ্যাস্টন ভিলা।