বাবা-মায়ের চরম অভাবের সংসার, কিন্তু সেই প্রতিকূলতাকে জয় করে পড়াশোনায় অদম্য আগ্রহ দেখিয়েছেন মোন্নাফ হোসেন। বাবা একজন নির্মাণশ্রমিক এবং মা একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার স্থানীয় কার্যালয়ে আয়া হিসেবে কর্মরত। বাবার কাজ সব সময় থাকে না, ফলে সংসারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তবে এই টানাপোড়েনের মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি মোন্নাফের আগ্রহ কমেনি। বাবা-মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির জোরে মাধ্যমিকের পর এবার উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার মো. মোন্নাফ হোসেন।

আজ শনিবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে এই সাফল্যের কথা জানা যায়। এইচএসসিতে প্রত্যাশিত ফলাফল করায় মোন্নাফ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মাঝে ব্যাপক আনন্দের পরিক্রমা চলছে। তাঁদের পারিবারিক নিবাস চান্দাইকোনা ইউনিয়নের সিমলা গ্রামে।

মোন্নাফের এখনকার স্বপ্ন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে উচ্চশিক্ষিত হওয়া এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের অভাব দূর করা। নিজের এই সাফল্যের মূল কৃতিত্ব তিনি তাঁর বাবা-মাকে দিয়েছেন।

মোন্নাফ বলেন, ‘আমার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। তাঁদের কষ্ট আমি কাছ থেকে দেখেছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেতে চাই। পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে বাবা-মায়ের জন্য কিছু করতে পারব—এটাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।’

চলতি বছর রায়গঞ্জ উপজেলার সরকারি বেগম নূরুণনাহার তর্কবাগীশ কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মোন্নাফ হোসেন। এর আগে ২০২৪ সালে উপজেলা সদরের ধানঘরা উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষাতেও তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলেন। এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া।

মোন্নাফের বাবা-মায়ের একমাত্র সম্বল হলো বসতবাড়ির চার শতাংশ জমি। কাজ থাকলে সংসার চলে, অন্যথায় জীবন থমকে দাঁড়ায়। অভাবের কারণেই তাঁদের একমাত্র মেয়ে রিশা খাতুনকে এসএসসি পাস করার পরপরই বিয়ে দিতে হয়েছে। তবে পরবর্তীতে তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে মোন্নাফের এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত তাঁর বাবা-মা। যত কষ্টই হোক, তাঁরা ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত হিসেবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।

মোন্নাফের মা মিরা খাতুন বলেন, ‘ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করব—এটাই আমার স্বপ্ন। এনজিও অফিসে আয়ার কাজ করে মাসে মাত্র ছয় হাজার টাকা বেতন পেতাম। সংসারে অভাব-অনটন ও ঋণ রয়েছে। তারপরও নিজেদের প্রয়োজন কমিয়ে ছেলের পড়াশোনার পেছনে টাকা খরচ করেছি। ছেলের এই ফলাফলে আমাদের সব কষ্ট সার্থক মনে হচ্ছে।’

বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইমারত নির্মাণের কাজ সব সময় থাকে না। কোনো দিন কাজ পাই, আবার কোনো দিন বাড়িতে বসে থাকতে হয়। অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করার স্বপ্ন কখনো ছাড়িনি। ছেলে ভালো ফল করেছে, এতে আমরা অনেক খুশি।’

তবে দারিদ্র্য মোন্নাফের উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না, সেই আশঙ্কা রয়ে গেছে। আর্থিক সংকটের কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে পারেননি। উচ্চশিক্ষার খরচ এবং ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে চিন্তিত এই পরিবারটি।

মোন্নাফ বলেন, ‘অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করতে পারিনি। তবুও চেষ্টা করছি। কিন্তু কোনো ভালো জায়গায় পড়ালেখার সুযোগ পেলে ভর্তি ও মাসিক খরচ জোগানো নিয়ে চিন্তায় আছি।’

সরকারি বেগম নূরুণনাহার তর্কবাগীশ কলেজের তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিষয়ের প্রভাষক মো. ময়নুল হক জানান, মোন্নাফ কলেজের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তিনি আরও বলেন, আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া একটি পরিবারের মেধাবী ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ালেখা কীভাবে করবে তা ভাবনার বিষয়। তবে কোনো হৃদয়বান মানুষ যদি তার পাশে সহায়তার হাত এগিয়ে দেন তাহলে খুব ভালো হয়।