রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে নেমে এসেছে। গত বছরের তুলনায় পাসের এই হার ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন।
আজ শনিবার বেলা ১১টার দিকে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল প্রকাশ করেন। বোর্ডের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন ১ লাখ ৪১ হাজার ৯৩৬ জন শিক্ষার্থী। তবে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৫৬ জন। তাঁদের মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ৬১ হাজার ৮৯৪ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন ৭৫ হাজার ৪৬২ জন।
লিঙ্গভিত্তিক ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যায়, ছাত্রদের পাসের হার ৩৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ছাত্রীদের পাসের হার ৫৩ দশমিক ০৩ শতাংশ। মোট জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন ৪ হাজার ৫২০ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ১ হাজার ৯৬৫ জন এবং ছাত্রী ২ হাজার ৫৫৫ জন। পাসের হার এবং জিপিএ-৫—উভয় ক্ষেত্রেই ছাত্রীরা এগিয়ে রয়েছেন।
রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার ৭৪৩টি কলেজের শিক্ষার্থীরা মোট ২০৮টি কেন্দ্রে এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। ফলাফলের তথ্যানুসারে, মাত্র ৯টি কলেজের সব পরীক্ষার্থী পাস করতে সক্ষম হয়েছেন। অন্যদিকে, ৩৯টি কলেজের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি।
বোর্ডের পূর্ববর্তী বছরের তথ্যের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে শতভাগ পরীক্ষার্থী পাস করেছিলেন। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮১ দশমিক ৬০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮১ দশমিক ২৪ শতাংশ। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা এবার কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশে।
জেলাভিত্তিক ফলাফলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাসের হার দেখা গেছে রাজশাহীতে, যা ৫৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া বগুড়ায় ৫৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ, জয়পুরহাটে ৪১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, পাবনায় ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ, নাটোরে ৩৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ, সিরাজগঞ্জে ৩৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন পাসের হার নওগাঁয় ৩৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, প্রস্তুতির জন্য অপর্যাপ্ত সময়, প্রশ্নের ধরনে আকস্মিক পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের মুঠোফোনে আসক্তি, শ্রেণিকক্ষবিমুখতা এবং কোচিং সেন্টারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
বোর্ডটির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ইফফাত জেরীন বলেন, “শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শ্রেণিকক্ষের চেয়ে কোচিং সেন্টারের ওপর বেশি নির্ভরশীল। শ্রেণিকক্ষ ও কোচিংয়ের পাঠদানের ধরন এক নয়। প্রশ্নের ধরনে পরিবর্তন এলে কোচিংনির্ভর শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ে।”
যেসব প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, তাদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। অধ্যাপক ইফফাত জেরীন আরও বলেন, “যেসব কলেজে কেউ পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ডেকে ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে। এরপরও উন্নতি না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জিপিএ-৫ পাওয়া একাধিক শিক্ষার্থী মনে করছেন, পরীক্ষার শুরুতেই প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হলে তারা সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারতেন। হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে অনেকের প্রশ্ন বুঝতে ও উত্তর দিতে সমস্যা হয়েছে। রাজশাহী কলেজের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী নিশাত নাবিলা বলেন, “পরীক্ষা চলাকালে প্রশ্নের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। শুরুতেই প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারত। হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে অনেকের প্রশ্ন বুঝতে ও উত্তর দিতে সমস্যা হয়েছে।”
শিক্ষার্থী রাজিয়া সুলতানা জানান, দীর্ঘ সময় পর পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রস্তুতির সময় ছিল খুবই কম। অন্য এক শিক্ষার্থী ইশরাক জামান জানান, আগের বছরের তুলনায় এবারের প্রশ্নপত্র কিছুটা কঠিন ছিল। এছাড়া অন্য বছর দুই মাস ধরে পরীক্ষা চললেও এবার তাত্ত্বিক পরীক্ষা প্রায় এক মাসেই শেষ হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল যন্ত্র ও মুঠোফোনের আসক্তি নিয়ন্ত্রণে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাজশাহী কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম আলী। তিনি মনে করেন, শ্রেণিকক্ষবিমুখতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের যথাযথ তদারকির অভাব ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মুঠোফোন ও ডিজিটাল যন্ত্রে আসক্তি নিয়ন্ত্রণেও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। করোনাকাল থেকে গত বছর পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।”